নগরীতে বেড়ে গেছে গরিবের যানবাহন ইজিবাইকের ভাড়া। ইজিবাইক চালকরা ভাড়া বৃদ্ধির দায়টা চাপাচ্ছেন গাড়ি মালিকদের ঘাড়ে। আর মালিকরা দুষছেন সরকারের বিদ্যুৎ বিল বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে।
চালকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আগে ইজিবাইকের ভাড়া বাবদ মালিকদের দিতে হতো প্রতি দিনের জন্য ৪৫০ টাকা করে। বিদ্যুতের দাম বাড়ার পর থেকেই তারা গাড়ি ভাড়া বাড়িয়ে ৬০০ টাকা করেছেন। কোথাও কোথাও মালিকদের দিন প্রতি ৬৫০ টাকা ভাড়া আদায়ের কথা জানান চালকরা।
গাড়ি মালিকদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। ফলে ইজিবাইক চার্জ দিতে তাদের বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে অনেক। এই বাড়তি খরচ পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বাড়তি মূল্য আদায় করতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।
মালিকপক্ষ জানান, আগে গ্যারেজে গাড়ির চার্জ বাবদ ১৫০ টাকা খরচ হতো। বর্তমানে বিদ্যুতের দাম বাড়ার কারণে গ্যারেজে গাড়ির চার্জ বাবদ ২৫০ টাকা দিতে হচ্ছে। ৬০০ টাকা গাড়ি ভাড়া নেওয়ার পর গ্যারেজ খরচ বাদ দিলে থাকে ৩৫০ টাকা। এর ভেতরে রয়েছে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ। আর কোনো যন্ত্র পরিবর্তন করতে হলেতো পকেট থেকে আরো টাকা খরচ করতে হয়। ফলে মাস শেষে লাভের মুখ আর দেখা হয় না।
এদিকে চালকরা তাদের আয় পুষিয়ে নিতে বাড়িয়ে দিয়েছেন যাত্রী ভাড়া। জুন মাসের আগেও খুলনার অনেক রুটে ইজিবাইকের ন্যূনতম ভাড়া ছিল ৫ টাকা। এখন ১০ টাকার কমে ইজিবাইকে যাতায়াত করা যাচ্ছে না। খুলনা মহানগরীতে নগর পরিবহনের কোনো ব্যবস্থা নেই। আগে রূপসা টু ফুলতলা নগর পরিবহনের বাস চলাচল করতো। সেটি এখন খুলনার জন্য অতীত ইতিহাস। সংগত কারণেই নগরীর সাধারণ মানুষকে যাতায়াতের জন্য ইজিবাইকই ভরসা।
সাধারণ যাত্রীরা জানান, আগে যেখানে ৫ টাকা ভাড়া ছিল, এখন সেখানে ১০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। ১০ টাকার ভাড়ার পরিবর্তে এখন ১৫ থেকে ২০ টাকা ভাড়া হাঁকা হচ্ছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের ইজিবাইকের বাড়তি ভাড়ার চাপে এখন ২/৩ কিলোমিটার পথ হেঁটে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
গতকাল রূপসা থেকে একটি ইজিবাইকে উঠে দেখা যায়, রূপসা থেকে রয়েল মোড় পর্যন্ত ১০ টাকা ভাড়া দাবি করছেন চালকরা। টুটপাড়া কবরস্থানের সামনে থেকে মডার্ন মোড় পর্যন্ত ২ জন যাত্রী ৫ টাকা করে ১০ টাকা দিতে চাইলে চালক তাদের তোলেননি। চালকের পরিষ্কার কথা, দু’জনের জন্য ২০ টাকা দিতেই হবে। রূপসা ঘাট থেকে সোনাডাঙ্গা আগে ভাড়া ছিল ২০/২৫ টাকা, বর্তমান ভাড়া ৩৫ টাকা, শান্তিধাম মোড় থেকে বয়রা বাজার পর্যন্ত আগে ভাড়া ছিল ২০ টাকা, বর্তমানে আদায় করা হচ্ছে ৩০ টাকা। ডাকবাংলা মোড় থেকে খালিশপুরের আগে ভাড়া ছিল ২০ টাকা, বর্তমানে দাবি করা হচ্ছে ২৫ টাকা।
নগরীর ইজিবাইক চালক আব্দুল্লাহ বলেন, কারেন্ট বিল বাড়ার অজুহাতে মালিকেরা গাড়ির ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমি ৬ বছর ধরে গাড়ি চালাই। বিদ্যুৎ বিলের সাথে আর সব সদাই পত্রের দাম বেড়েছে। তাই গাড়ি মালিককে বাড়তি ভাড়া দেওয়ার পর যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া আদায় করতে না পারলে পরিবার পরিজন নিয়ে টিকে থাকা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ইজিবাইক চালক তনু বলেন, পরিবারে একমাত্র আমি আয় করি। এই ইজিবাইকের ইনকাম থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে টিকে থাকতে হয়। মালিকেরা গাড়ির ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ার পর যাত্রি ভাড়া না বাড়ালে আমাদের কোন উপায় নেই। আমাদেরও তো পরিবার-পরিজন নিয়ে খেয়ে পড়ে বাঁচতে হবে।
যাত্রী ফাতেমা বেগম জানান, তিনি লবণচরায় থাকেন। নগরীতে বাসা বাড়িতে কাজ করে তার দিন চলে। প্রতিদিন তিনি লবনচরা থেকে অটোতে করে রয়্যাল মোড়ে নামেন। আগে তিনি ২০ টাকা দিয়ে আসা যাওয়া করতেন। এখন ৩০ টাকা ভাড়া চাওয়া হয়। ২৫ টাকার কমে আসে না। আসা যাওয়া খরচ দৈনিক ৫০ টাকা হিসাবে মাসের দেড় হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। ৫ হাজার টাকা আয় করে এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
যাত্রী রুবি বলেন, আমার বাসা সোনাডাঙ্গায়। আমি দুটি ম্যাসে রান্নার কাজ করি। মাসে সব মিলিয়ে ৭০০০ টাকা আয় হয়। আগে ১০ টাকা দিয়ে ডাকবাংলা মোড়ে নামতাম। এখন ২০ টাকার নিচে আসা যায় না।
তিনি বলেন, ইজিবাইক ভাড়া বাবদ এত টাকা খরচ হয়ে গেলে সংসার চলে কি করে? ভাড়া বাড়া আমাদের জন্য একটা গজব।
খুলনা গেজেট/এনএম

