বুধবার । ১লা জুলাই, ২০২৬ । ১৭ই আষাঢ়, ১৪৩৩
বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা

সংস্কারের মধ্যেই ধস, ২৪০ মিটারে চার পাইপ

তরিকুল ইসলাম

কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ নদ তীরবর্তী পানি রক্ষা বাঁধ সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার আগেই ধস দেখা দিয়েছে। সংস্কারাধীন ২৪০ মিটার বাঁধের ভেতরে লবণ পানি উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত চারটি পাইপ অপসারণ না করেই কাজ চালানোয় প্রকল্পের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, পাইপ রেখে বাঁধ সংস্কার করলে অল্প সময়ের মধ্যেই আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার দশহালিয়া থেকে হোগলা অভিমুখে কপোতাক্ষ নদসংলগ্ন ২৪০ মিটার বাঁধ অনুন্নত রাজস্ব খাত (এনডিআর) প্রকল্পের আওতায় সংস্কার করা হচ্ছে। ২৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন অ্যান্ড কোং। গত ৯ ফেব্রুয়ারি কাজ শুরু হয়েছে, যা আগামী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা।

গত রবিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, বাঁধের প্রায় ১০০ মিটারের মধ্যেই তিনটি এবং অপর অংশে আরও একটি পাইপ রয়েছে। এসব পাইপ অপসারণ না করেই মাটি ফেলে বাঁধ উঁচু করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পাইপসংলগ্ন দু’টি স্থানে ধস নেমেছে। একটি স্থানে নদীতে মাটি ভেঙে পড়ায় সেখানে জিও ব্যাগ ও বাঁশের পাইলিং দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে। কাজের পাশে প্রকল্পের তথ্য সম্পর্কিত কোনো সাইনবোর্ড নেই। এছাড়া বাঁধসংলগ্ন নদীর চরে বড় বড় গর্ত এবং বাঁধের ঢাল অস্বাভাবিক খাড়া করে নির্মাণের চিত্রও দেখা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁধের পাশ থেকেই মাটি কেটে সংস্কারকাজে ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু জিও ব্যাগে মানসম্মত বালির পরিবর্তে কাঁদাযুক্ত ও অপর্যাপ্ত বালি ভরা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা বাবু, মোস্তাফিজ ও আব্দুল হাই জানান, ওই এলাকায় প্রায় দুই কিলোমিটার জুড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি পাইপ রয়েছে। বছরের পর বছর এসব পাইপ দিয়ে নদী থেকে লবণ পানি তুলে মাছের ঘের করা হচ্ছে। জোয়ার-ভাটার সময় পাইপের চারপাশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় বাঁধের মাটি সরে গিয়ে তা দুর্বল হয়ে পড়ে। অতীতে কয়েকবার বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। তাদের মতে, পাইপ রেখে সংস্কার করে লাভ হবে না। স্থায়ী সমাধানের জন্য বাঁধের সব পাইপ অপসারণ করে টেকসইভাবে পুনর্নির্মাণ করতে হবে।

সাবেক ইউপি সদস্য দিদারুল ইসলাম বলেন, “নতুন বাঁধের ভেতরে থাকা চারটি পাইপসহ সব পাইপ অপসারণ করতে হবে। এরপর সঠিকভাবে বাঁধ পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার করলে কাজটি দীর্ঘস্থায়ী হবে। অন্যথায় কয়েক দিনের মধ্যেই আবার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে, যা সরকারি অর্থের অপচয়।”

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, “দশহালিয়া এলাকার বাঁধ একাধিকবার ভেঙে আমরা কয়েকবার প্লাবিত হয়েছি। প্রতিবার বাঁধ ভাঙলে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়। বাঁধের পাশের লবণ পানির ঘের বন্ধে সরকারি নির্দেশনা থাকলেও প্রশাসনের গাফিলতির কারণে তা কার্যকর হচ্ছে না। টেকসই পরিকল্পনা ছাড়া প্রতিবছর একইভাবে বাঁধ সংস্কার করায় সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “মানবিক দিক বিবেচনায় একান্তই যদি সেখানে মৎস্য ঘের পরিচালনার সুযোগ দিতে হয়, তাহলে বাঁধের ভেতর দিয়ে ক্যানেল নির্মাণ করে শাকবাড়িয়া খাল থেকে পানি নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে বিলের মধ্যে অবস্থিত কৈখালী খাল পুনঃখনন করে সেখান থেকেও ঘেরে পানি সরবরাহ করা সম্ভব। এতে বাঁধ ছিদ্র করে পাইপ বসানোর প্রয়োজন হবে না, বাঁধও দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ থাকবে।”

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজের তদারককারী পলাশ বলেন, “নিয়ম মেনেই কাজ করা হচ্ছে। পাইপের কারণেই সংস্কারের পর ধস নেমেছে। এতে আমাদেরও ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনরায় ঠিক করা হচ্ছে।”

কয়রা পানি উন্নয়ন উপ-বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী সোলাইমান হোসেন বলেন, “ধসে যাওয়া স্থানগুলো ঠিকাদারের মাধ্যমে পুনরায় মেরামত করা হচ্ছে।”

এ বিষয়ে কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, “পাইপ অপসারণে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জনপ্রতিনিধি, সংশ্লিষ্ট দপ্তর, সুশীল সমাজ ও ঘের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন