শনিবার । ২০শে জুন, ২০২৬ । ৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩

সুন্দরবনের ভাসমান সম্পদে জ্বলে চুলার আগুন

সাইফুল ইসলাম, কয়রা

সুন্দরবনের নদী-খাল ও বনাঞ্চল থেকে জোয়ার-ভাটার স্রোতে ভেসে আসা শুকনো গাছের পাতা, ডালপালা ও বিভিন্ন ফল সংগ্রহ করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করছেন উপকূলের নারীরা। জ্বালানি সংকট ও দারিদ্র্যের কারণে এসব প্রাকৃতিক উপকরণই হয়ে উঠেছে তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।

উপকূলীয় অঞ্চলে জীবিকার পাশাপাশি জ্বালানি সংগ্রহও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর নারীরা প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন এসব প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহে। এতে একদিকে পরিবারের খরচ কমে, অন্যদিকে ভেসে আসা উপকরণের পুনঃব্যবহারও নিশ্চিত হয়।

কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর তীরে দেখা যায়, এক নারী কোমরসমান পানিতে নেমে ভেসে আসা শুকনো পাতা ও ফল সংগ্রহ করছেন। ঝুড়িভর্তি এসব পাতা ও ফল বাড়িতে নিয়ে শুকিয়ে রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, জোয়ারের পানির সঙ্গে সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের পাতা, ফল ও শুকনো ডাল ভেসে আসে, যা উপকূলের দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য বিনামূল্যে জ্বালানির উৎস।

উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের বাসিন্দা অঞ্জনা মুন্ডা বলেন, “ভেসে আসা ফলগুলোর ভেতরে শাঁস থাকলে শুকাতে সময় লাগে। তাই আমরা শাঁস ফেলে দিয়ে খোলস শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করি। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে কিছু ফল বিক্রিও করি। তবে বনের বাইন গাছের ফল সহজে পোড়ে না, তাই সেগুলো গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।”

স্থানীয় নারীরা জানান, “অভাবের কারণে অনেক পরিবার জ্বালানি কাঠ কিংবা গ্যাস কিনতে পারে না। ফলে নদী ও খালের তীরে ভেসে আসা শুকনো পাতা, গোলপাতার অংশ, কেওড়া ও গেওয়া গাছের ঝরা ফল সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়। প্রতি জোয়ারে একজন মানুষ এক থেকে দেড় মণ পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করতে পারেন বলেও জানান তাঁরা।”

সম্প্রতি শাকবাড়িয়া নদীর তীর থেকে ঝুঁড়িভর্তি ফল সংগ্রহ করে রাস্তার পাশে শুকাতে দেখা যায় কাটকাটা গ্রামের মধ্যবয়সি নারী সুরভি ম-লকে। তিনি বলেন, “সারা বছরই এসব ফল সংগ্রহের কাজ চলে। এলাকায় জ্বালানির খুব সংকট। তাই আমরা দল বেঁধে নদীর তীর থেকে ভেসে আসা সুন্দরবনের বিভিন্ন গাছের ফল সংগ্রহ করি। এসব ফল জ্বালানি ছাড়াও ছাগলের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।”

সুন্দরবনসংলগ্ন কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া ও কয়রা নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা শ্রাবন্তী রানী, সূর্য মুন্ডা ও নিলিমা রানী জানান, “সুন্দরবনের গাছের ফল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে প্রাকৃতিক বনায়নের ক্ষতি হয়। কিন্তু জ্বালানি কাঠের অভাবে তাঁরা বাধ্য হয়ে এসব ফল সংগ্রহ করেন।”

উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের বাসিন্দা ঘুগরাকাটি ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা সুজাউদ্দিন বলেন, “সুন্দরবনের বিভিন্ন বৃক্ষের পাতা ও ফল নদীর পানিতে ভেসে লোকালয়ে এলে সাধারণ মানুষ সেগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু এসব ফল সংরক্ষণ করা গেলে নদীর চরগুলোতে প্রাকৃতিক সবুজ বেষ্টনী গড়ে উঠতে পারত।”

কয়রা উপজেলা বন কর্মকর্তা জহিরুল হক বলেন, “সুন্দরবন থেকে ভেসে আসা ফল জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করার ফলে প্রাকৃতিক বনায়ন ব্যাহত হচ্ছে। সচেতনতার অভাবে মানুষ এসব ফল সংগ্রহ করছে। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের বারবার সতর্ক করা হয়েছে।”

সুন্দরবনের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন বলেন, “সুন্দরবনের গাছ থেকে ঝরে পড়া ফলের একটি অংশ বনেই চারা হিসেবে জন্ম নেয়। তবে অধিকাংশ ফল জোয়ারের পানিতে ভেসে লোকালয়ের নদীর তীরে জমা হয়। এসব ফল উপকূলের মানুষের সাময়িক জ্বালানি সমস্যার সমাধান করলেও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। কারণ, এসব ফল থেকে বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে নতুন বনায়নের সম্ভাবনা ছিল।”

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন