শুক্রবার । ৫ই জুন, ২০২৬ । ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
বাতাস বিষাক্ত, শব্দ মাত্রাতিরিক্ত ও পরিবেশ দুর্গন্ধময়

দূষণের কবলে খুলনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

এক সময়ের নির্মল হাওয়া ও শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত শিল্পনগরী খুলনা এখন ধুলোবালি, বর্জ্য আর দূষণের চাদরে ঢাকা পড়েছে। অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন কাজ, সমন্বয়হীন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ভারত থেকে আসা বাতাসে নগরীর বায়ু মান মাঝে মাঝে বিপদজনক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরগুলোর তালিকায় খুলনার অবস্থান এখন ৬৮তম।

এদিকে নগরীতে মাত্রাতিরিক্ত ইজিবাইক, ব্যক্তিগত যানবাহন বাড়ছে দ্রুত গতিতে। নগরীর শিববাড়ি, গল্লামারী, ডাকবাংলো, ময়লাপোতা মোড় ও সোনাডাঙ্গ বাস টার্মিনাল মোড়ে শব্দ দূষণ স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়েছে অনেক আগেই।

এছাড়া প্রধান সড়কগুলোর পাশে বর্জ্যরে জট শহরের পরিবেশ করেছে দুর্গন্ধময়। ২০২৩ সালে একনেকে অনুমোদন হওয়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সড়কের পাশ থেকে বর্জ্য সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হলেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। এতে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়ছে।

বিপদজনক এমন পরিস্থিতিতে আজ ৫ জুন সারাদেশের ন্যায় খুলনায় পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের অন্যতম বায়ু দূষণের শহর হিসেবে পরিচিত ঢাকাকে পিছিয়ে দিচ্ছে খুলনা। ভারত থেকে আসা বাতাস এবং রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কারণে নগরীর বাতাস এখন ধূলিকণায় ধূসর। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সড়কের পাশে উন্মুক্ত অবস্থায় ইট, বালু ও সিমেন্ট রেখে ব্যবসা বন্ধ করা যাচ্ছে না। যা বাতাসে অতি ক্ষুদ্র ভাসমান কণার (পিএম-২.৫) মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, খুলনার বাতাসে বস্তুকণার বার্ষিক গড় ঘনত্ব প্রতি ঘনমিটারে ৫২ দশমিক ৭ মাইক্রোগ্রাম। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে ১০ গুণেরও বেশি।

খুলনা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরীতে প্রতিদিন এক হাজার টন কঠিন বর্জ্য ও আবর্জনা উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ৮০০ টন বর্জ্য কেসিসির কর্মীরা সংগ্রহ করে রাজবাঁধ নিয়ে যায়। বাকি ২০০ টন ড্রেন, সড়কের পাশে পড়ে থাকে। যা বাতাসের দূষণ ঘটায়।

সরেজমিন নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে নিউ মার্কেটের পাশে, নতুন বাজার মোড়, নিরালা ও পিটিআই মোড়ের মতো প্রধান প্রধান সড়কের অর্ধেকটা জুড়ে ময়লা ফেলে রাখা হচ্ছে। নাগরিক দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয় ড্রেন পরিষ্কারের পদ্ধতি। ড্রেন থেকে ভেজা কাদা ও ময়লা তুলে সরাসরি রাস্তার ওপর স্তূপ করে রাখা হয়। এগুলো রোদে শুকিয়ে ধুলোবালি হিসেবে বাতাসে ওড়ে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই আবার ড্রেনে গিয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি করে।

তবে কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, খুব শিগগিরই শহরের প্রধান সড়কগুলোর পাশ থেকে বর্জ্য ফেলার স্থান (এসটিএস) সরিয়ে নেওয়া হবে। এজন্য নগরীর বিভিন্ন স্থানে এসটিএস নির্মাণ করা হচ্ছে। বর্জ্যরে মাধ্যমে যাতে দূষণ না ঘটে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এদিকে এছাড়া সোনাডাঙ্গা ও গল্লামারী বাস টার্মিনাল এলাকায় হাইড্রোলিক হর্নের তীব্র শব্দদূষণে (৮৫-১০০ ডেসিবেল) সাধারণ মানুষের শ্রবণশক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শরীফুল ইসলাম বলেন, মাত্রাতিরিক্ত শব্দ ও হাইড্রোলিক হর্নের ব্যবহার বন্ধে মাঝে মাঝে অভিযান চালানো হচ্ছে। এছাড়া এর ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে প্রচারণা চালানো হয়।

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, ঘটা করে পরিবেশ দিবস পালন করলেই শুধু হবে না, খুুলনাকে বাসযোগ্য করতে হলে অবিলম্বে সমন্বিত ক্রাশ প্রোগ্রাম হাতে নিতে হবে। এর মধ্যে নগরীতে সবুজায়ন বাড়ানো, শুষ্ক মৌসুমে প্রধান সড়কগুলোতে নিয়মিত পানি ছিটানোর ব্যবস্থা করা, খোলা অবস্থায় নির্মাণসামগ্রী রাখলে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক তাৎক্ষণিক জরিমানা করা, শব্দদূষণ বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো এবং কেসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আরও আধুনিক করতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খুলনার পূর্বের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন