মহানগরীর নিরালা আবাসিক এলাকার নিরালা খালের ওপর নির্মিত হচ্ছে খুলনার প্রথম উড়াল সড়ক। প্রায় ৬০ কোটি টাকা খরচ করে ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই ওভারপাস বা উড়াল সড়ক নির্মাণ করছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)।
শুরু থেকেই এই উড়াল সড়কের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। তারা বলছেন,থমৃতপ্রায়থনিরালা খালে ডিঙ্গি নৌকা ছাড়া বড় নৌযান চলাচলের কোনো সম্ভাবনা নেই। মাঝারি আকারের কালভার্ট তৈরি করলেই পানি নিষ্কাশন ও নৌকা চলাচল স্বাভাবিক থাকত। সেখানে ওভারপাস নির্মাণ করে সরকারের ৬০ কোটি টাকা গচ্চা দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া খাল সংস্কার প্রকল্পের আওতায় খুলনা সিটি করপোরেশনও (কেসিসি) নিরালা খালের ওপর তিনটি সেতু (প্রকল্পের ভাষায় লাইট ট্রাফিক ব্রিজ) নির্মাণ করবে। খালের পানি থেকে ৭ ফুট উচ্চতায় নির্মিত প্রতিটি সেতুর ব্যয় হচ্ছে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। একই খালের ওপর ৬০ কোটি টাকা দিয়ে কেডিএ’র উড়াল সড়ক নির্মাণকে ‘অপ্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয়’ বলছেন তারাও। মূলত পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ করিয়ে ৬০ কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যই ছিল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য।
কেডিএ থেকে জানা যায়, সাতক্ষীরা সড়ক ও সিটি বাইপাস সড়কে সংযুক্ত করে সংযোগ সড়কসহ লিংক রোড নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় খুলনায় নতুন তিনটি সড়ক নির্মাণ হচ্ছে। প্রায় ৭১৭ কোটি টাকার এই প্রকল্পের প্রথম সড়কটি নিরালা মোড় থেকে ১ নম্বর সড়ক হয়ে দিঘির পাশ দিয়ে শহর বাইপাস (রূপসা সেতু অ্যাপ্রোচ) সড়কে গিয়ে মিশবে। প্রায় আড়াই কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কটি ৬০ ফুট চওড়া এবং চার লেন হবে। নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি টাকা।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে খালের ওপরথকালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। পরে ২০০০ সালের দিকে প্রকল্প সংশোধন করা হয়। তখন খাল ও কবরস্থানের ওপর ওভারপাস নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। খালের সাড়ে ৫ মিটার উচুতে ৮০ মিটারের ওভারপাস নির্মাণ করতে গিয়ে দুই পাশে আরও ২২০ মিটার ভায়াড্যাক্ট তৈরি করতে হয়েছে। এতে মোট ওভারপাসের দৈর্ঘ্য দাড়িয়েছে ৩০০ মিটার।থএ জন্য ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডিয়েনকো লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে ৭০ ভাগ কাজ কারা শেষ করেছে। অর্ধেক টাকা তুলে নিয়েছে ঠিকাদার। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তাদের সব কাজ শেষ করতে হবে।
সরেজমিন দেখা যায়, ওভারপাসের মূল অংশের কাজ শেষ। বর্তমানে দুই পাশে ভায়াড্যাক্টের কাজ চলছে। সড়ক নির্মাণের জন্য মালামাল আনা নেওয়া করতে কবরস্থান ও খালের একপাশ ভরাট করা হয়েছে। সেই অংশ দিয়ে প্রচুর ট্রাক চলাচল করছে।
নিরালা খালের কাছে গিয়ে দেখা যায়, কাগজ-কলমে ৯০-১২০ মিটার থাকলেও বাস্তবে নিরালা খালটি ১০-১২ ফুটের নালায় পরিণত হয়েছে। খালের উজান ও ভাটিতে নৌযান চলাচলের মতো অবস্থা নেই।
নিরালা আবাসিক এলাকা জনকল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুস সবুর বলেন, ‘সেতু ও সড়ক নির্মাণের মালামাল নিয়ে পাশে রাস্তা তৈরি করেছে। খালের জায়গায় কালভার্ট করে স্থায়ী রাস্তা বানালেই চলতো। বিশাল ব্রিজের দরকার কি ছিল বুঝলাম না। আর ব্রিজের জন্য পুরো এলাকার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘কেডিএর প্রথম দুই মাস্টার প্লানে এখানে সড়ক ছিল না। এজন্য মানুষ এই আবাসিক এলাকায় বাড়ি কিনে বসবাস শুরু করে। এখন আবাসিকের ভেতরে প্রধান সড়ক হলে পুরো এলাকার পরিবেশই নষ্ট হবে। যানজটও বাড়বে। ব্রিজের কারণে সড়ক এতো উচু করা হয়েছে-যে আশপাশের প্রায় ৫ হাজার বাড়ির নিচতলায় আগামী বর্ষায় পানি প্রবেশ করবে।’
নগর পরিকল্পনাবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স খুলনা চেপ্টারের সাধারণ সম্পাদক আসিফ আহমেদ বলেন, ওভারপাসটি খালের সরু অংশ অতিক্রমের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তাহলে ১৫ মিটার উচ্চতার প্রায় ৩০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে কাঠামো কতোটা প্রয়োজনীয় তা স্পষ্ট করা জরুরী। এছাড়া খালের ওই অংশে বড় নৌযান চলাচল করে না। সেক্ষেত্রে ১৫ মিটার উচ্চতার ক্লিয়ারেন্স আদৌ প্রয়োজন ছিল কিনা, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। যদি বড় নৌযান চলাচল না করে, তাহলে কম উচ্চতার সেতু নির্মাণের মাধ্যমে ব্যয়, আবাসিক এলাকার ওপর প্রভাব সবকিছু কমানো সম্ভব ছিল কি-না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সেতুটি আবাসিক এলাকার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করায় এলাকার স্বাভাবিক আবাসিক বৈশিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। ফিডার রোড না থাকলে আবাসিক এলাকার মানুষ এই সেতুর সুবিধা ভোগ করতে পারবে না।
তবে প্রকল্প পরিচালক ও কেডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মোর্ত্তজা আল মামুন বলেন, সড়কের নকশা প্রণয়নের সময় দেখা গেল সড়কের মাঝে একটি কবরস্থান এবং খাল রয়েছে। তখন ওই সময়কার মেয়রসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে কবরস্থান ও খালের ওপর ওভারপাস নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। খালের ওপর ব্রিজ নির্মাণের জন্য নেভিগেশন ক্লিয়ারেন্স নিতে হয়েছে। এ জন্য পানি থেকে সাড়ে ১৫ মিটার উঁচুতে ওভারপাস নির্মাণ হচ্ছে। উঁচু ওভারপাস ও দু’পাশে ঢাল তৈরির জন্য দৈর্ঘ্য ৩০০ মিটার হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্মাণ কাজের জন্য কবরস্থান ও অন্যান্য জায়গা ভরাট করা হয়েছে। কাজ শেষ হলে সেগুলো উন্মুক্ত করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
খুলনা গেজেট/এনএম

