শনিবার । ১৬ই মে, ২০২৬ । ২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

সংকটে খুলনার কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীরা

মোহাম্মদ মিলন

নেই স্থায়ী মার্কেট। বন্ধ হয়েছে দোকান। ঐতিহ্য হারিয়েছে খুলনা শহরের শেখপাড়া চামড়াপট্টি। গত ৭ বছরে চামড়া বেচাকেনার জন্য নতুন কোনো বাজারও তৈরি হয়নি। সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় প্রতিবছর কোরবানির ঈদে বিপুল সংখ্যক চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। দেনার দায়ে জর্জরিত ব্যবসায়ীরা। ফলে ব্যবসা গুটিয়েছে অসংখ্য ব্যবসায়ী। আর যারা টিকে আছে তাদের দাবি স্থায়ী মার্কেট আর ন্যায্য মূল্যে চামড়া বিক্রির ব্যবস্থার।

ব্যবসায়ীরা বলেছেন, খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) কাছে বারবার চামড়া বেচাকেনার জন্য পৃথক মার্কেট তৈরির দাবি জানানো হয়েছে। বলা হয়েছিল আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ হচ্ছে, তার আশপাশে চামড়ার জন্য পৃথক মার্কেট তৈরি করার বিয়ষটি বিবেচনায় রয়েছে। কিন্তু আশ্বাস দিয়েও কেসিসি তা রাখেনি। সঙ্কট নিরসনে একটি স্থায়ী চামড়ার মার্কেট স্থাপনের দাবি করা হলেও এখনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই কোরবানির ঈদ চলে এসেছে, এবারও বিপুল সংখ্যক চামড়া সংরক্ষণ নিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে। এ ছাড়া খুলনার চামড়া ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ টাকা ঢাকার ট্যানারি মালিক ও আড়ৎদারদের কাছে বকেয়া রয়েছে। বকেয়া টাকা কেউ পরিশোধ করেননি।

খুলনার চামড়াপট্টির ব্যবসায়ী বাবর আলী বলেন, ৩৫ জনের মতো ব্যবসায়ী এখানকার ১০টি মতো দোকানে ব্যবসা করতাম। বাড়িওয়ালারা এখানে চামড়ার দোকান রাখতে নারাজ ছিল। পরবর্তীতে সবগুলো দোকান আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায়। যার কারণে আমরা দোকান রাখতে পারিনি। ট্যানারি কোম্পানীকে চামড়া দিলেও টাকা না পাওয়ায় আমাদের বিপাকে পড়তে হয়েছে। অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।

তিনি বলেন, আশপাশে আমাদের মার্কেট দরকার। মার্কেটের ব্যবস্থা করা হলে আমরা ভালোমতো ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবো। একইসঙ্গে সরকার যেভাবে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেইভাবে চামড়া কেনার ব্যবস্থা করলে আমরা উপকৃত হবো। আর যারা আমাদের কাছে চামড়া বিক্রি করতে আসবে তারাও ন্যায্য মূল্য পাবে। আমরা কাউকে ঠকাবো না, আমাদেরও কেউ ঠকাতে পারবে না। নতুন সরকার ও নতুন কেসিসি প্রশাসকের কাছে দাবি আমাদের একটি মার্কেটের ব্যবস্থা করা হোক।

খুলনা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কার্তিক ঘোষ বলেন, সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় বিপাকে পড়তে হয় ব্যবাসয়ীদের। এখনও মানুষের কাছে নামকরা জায়গা হচ্ছে চামড়াপট্টি। কিন্তু এখন সেই ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। অনেক ব্যবসায়ী ছিল যারা সারা বছর এই কাজ করতো। তখন মহাজন ছিল। আর মৌসুমে ফড়িয়ারা ব্যবসায় করতো। এখন আর মহাজন আর ফড়িয়া বলে কিছু নেই। এখন সবাই ব্যবসায়ী। সেই ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কমে এসেছে। গেল দুই বছর আমি নিজেও চামড়া বেচাকেনা করি না। হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী রয়েছে। সেটাও কোরবানীর সময় তারা করে। সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী ব্যবসা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। অনেকে মারা গেছেন। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবসায়ীদের জন্য একটা মার্কেট প্রয়োজন।

কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুস সালাম ঢালী বলেন, চামড়া ব্যবসা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দুই তিন যুগ ধরে উচ্চ পর্যায় থেকে ঠিক না হলে ব্যবসা ভালো হবে না। কোরবানীর সময়ে ৬০-৭০ হাজার চামড়া সংগ্রহ করতাম। আমাদের ৬০-৭০ জন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী ছিল। এখন হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসা করছে। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। কেউ কেউ ব্যবসা ছেড়ে ভ্যানে মালামাল বিক্রি করছে। অনেকের ব্যবসা ধ্বংস আর ঋণের চিন্তায় রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ৮/১০ জন ব্যবসায়ী কোনো রকম ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে।

তিনি বলেন, নেই কোনো আধুনিক জবাইখানার ব্যবস্থা। যেখানে নিরাপদে টাকা পয়সা নিয়ে যেয়ে চামড়া কিনতে পারবো। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে- ব্যবসায়ীরা ধারদেনা করে, গহনা বিক্রি করে, ব্যক্তি ঋণ নিয়ে অর্থ খাটিয়ে চামড়া কেনে। অথচ এই চামড়া ট্যানারিতে দেওয়ার পর কোটি কোটি টাকা বকেয়া রাখে। এখনও পর্যন্ত দেয়নি। ফলে আমরা পথে বসে গেছি। এছাড়া খুলনায় এতো দিনেও গড়ে ওঠেনি একটি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের মার্কেট। চামড়া ব্যবসায়ীদের এবং এই শিল্প বাঁচাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ব্যবসায়ীরা চামড়ার মার্কেটের কথা জানালে সিটি কর্পোরেশন এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করবে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন