শুক্রবার । ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩
ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, বিপাকে পরীক্ষার্থীরা

লোডশেডিংয়ে হুমকির মুখে হিমায়িত চিংড়ি শিল্প

এসএম মাহবুবুর রহমান

একদিকে জ্বালানি সংকট অপরদিকে লাগাতার লোডশেডিংয়ে হিমায়িত চিংড়ি শিল্পে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। লোডশেডিংয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে ফ্যাক্টরি চালু রাখতে প্রয়োজনীয় ডিজেল পেতে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এসব চিংড়ি শিল্প বাঁচিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সহজ শর্তে সরাসরি ডিপো থেকে ডিজেল সরবরাহ করা প্রয়োজন বলে দাবি করেন এ শিল্প সংশ্লিষ্টরা। তা-না হলে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে।

এদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সন্ধ্যা ৭টায় দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নগরীর ব্যবসায়ীরা। তাদের পণ্য বিক্রি ৩০ শতাংশ কমে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ক্ষতির পাশাপাশি লোডশেডিংয়ে চলতি এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা সব থেকে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে। পড়ার টেবিলে বসতে না বসতে চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। একদিকে তীব্র দাবদাহ অপরদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ এসব শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় বিরূপ প্রভাব পড়ছে। প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগের শিকার সাধারণ মানুষ।

রূপসার ইলাইপুরে অবস্থিত ফ্রেস ফুডস লিঃ কর্তৃপক্ষ জানায়, চিংড়ি মৌসুম পুরোপুরি এখন শুরু হয়নি। তারপরও চালু রাখতে হয় সব বিভাগ। দু’শতাধিক শ্রমিক কর্মচারী রয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে। কিন্তু বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে প্রতিষ্ঠান অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গত বুধবার সকাল থেকে রাত অবধি ৫ বারে ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট বিদ্যুতের লোডশেডিং হয়েছে। দিন রাত ২৪ ঘণ্টায় যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসতো ২৯ হাজার টাকা সেখানে ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে জেনারেটরের জন্য ৫৫ হাজার ৩১৫ টাকার ডিজেল কিনতে হয়েছে। একদিনে ভর্তুকি গুনতে হয়েছে ৩০ হাজার টাকার বেশি।

সাউদার্ণ ফুডস লিঃ এর এজিএম মোঃ মিজানুর রহমান বলেন, ‘গত বুধবার ২৬ ঘণ্টার মধ্যে ৫ বারে ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট লোডশেডিংয়ে ফ্যাক্টরি চালু রাখতে ৬৩ হাজার ৮৫০ টাকার ডিজেল কিনতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘প্রতি ঘণ্টায় জেনারেটরে ৭৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। একদিনে যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসে ৩৫ হাজার টাকা সেখানে ডিজেল কিনতে হয়েছে ৬৩ হাজার ৮৫০ টাকার।’

তিনি বলেন, ‘আগে পাম্পে গেলেই ডিজেল পাওয়া যেতো কিš এখন পূর্বের মতো চাহিদা মোতাবেক ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। তা ছাড়া এই তেল পেতে ফ্রোজেন ফুডস এসোসিয়েশন, জেলা প্রশাসক ও ইউএনও বরাবর আবেদন করতে হচ্ছে। একদিকে লোডশেডিং অপরদিকে জ্বালানি তেল নিয়ে নানা সমস্যা; সব মিলিয়ে খুব ঝামেলায় আছি। উৎপাদন অনুযায়ী কর্মকর্তা কর্মচারী ও শ্রমিকদের বেতন উঠছেনা। ভর্তুকি দিয়ে ফ্যাক্টরি চালু রাখতে হচ্ছে।’

রূপসার রোজেমকো ফুডস লিঃ এর পরিচালক তদন্ত সেলিম রেজা ও ব্যবস্থাপক তদন্ত নাজমুল হুদা চৌধুরি বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে এখনো মাছের রমরমা হয়নি। তারপরও ফ্যাক্টরির ৪ শতাধিক কর্মকর্তা কর্মচারী ও শ্রমিকের প্রতিমাসে ৩৫ লাখ টাকা বেতন দিতে হচ্ছে। এরই মাঝে চলছে ঘন ঘন লোডশেডিং। গত বুধবার দিন ও রাতে ১০ ঘণ্টা ২৫ মিনিট লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে। আমাদের ৫টি হিমাগারে ৩৫ কোটি টাকার মাছ রয়েছে। যা বাঁচাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। এক ঘণ্টায় যেখানে বিদ্যুৎ বিল আসে সাড়ে ৪ হাজার টাকা সেখানে বিদুৎ না থাকলে ডিজেল কিনতে হচ্ছে ২৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ১৮ হাজার ৫শ টাকা ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে।’ এ দুই কর্মকর্তা গার্মেন্টসের মত চিংড়ি শিল্পকে শিল্প ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত করে সহজ শর্তে সরাসরি ডিপো থেকে তেল সরবরাহের দাবি জানান।

খুলনা হার্ডমেটাল গ্যালারির হৃদয় ইলেকট্রনিক্স এর টিএসএম মোঃ আনোয়ার জাহিদ বলেন, ‘এমনিতেই তীব্র গরম। দিনের বেলা মানুষ বাইরে বের হতে পারছেনা। সন্ধ্যার পর মানুষ কেনাকাটা করতে বের হতে না হতে সন্ধ্যা ৭টায় দোকান বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। পূর্বের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেচাকেনা কমে গেছে।’

রূপসা উপজেলার বাগমারা এলাকার এসএসসি পরীক্ষার্থী চাঁদনী আক্তার, শাকিলা ইয়াসমিন নদী, জাহারীন তাসনিম, জান্নাত জেরিন, মিম্মা আক্তার পিয়ামনি, আরমান রানা, মুসফিক আল রাতুল, মুসফিকা আফরিন, রেসমি আক্তার, মিতু খাতুন ও মাহিরা আক্তার মিতুসহ একাধিক শিক্ষার্থী জানায়, ‘সন্ধ্যার পর পড়ার টেবিলে বসতে না বসতে বিদুৎ চলে যাচ্ছে। আর একবার গেলে তো খবর থাকেনা। দেড় থেকে দু’ঘণ্টা পর আসে। তীব্র তাপদাহে বিদ্যুতের সীমাহীন লোডশেডিংয়ে লেখাপড়া মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।’

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ১৮২ মেগাওয়াট আর দুপুর ১টায় ছিল ১৫৮ মেগাওয়াট। এর আগে বুধবার দুপুরে চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ২০৩ মেগাওয়াট।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম থাকায় এই ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে ফিডার ভিত্তিক লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় ৭৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬১৯ মেগাওয়াট। এ সময় ঘাটতি ছিল ১৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এদিন দুপুর ১টায় ৮০১ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৬৪৩ মেগাওয়াট। আর ঘাটতি ছিল ১৫৮ মেগাওয়াট।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন