বৃহস্পতিবার । ২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩

খাওয়ার পানির জন্য খুলনার ৩শ’ গ্রামের মানুষের চোখ থাকে মেঘ-বৃষ্টির দিকে

কাজী মোতাহার রহমান

সুন্দরবনের গা ঘেষে দাঁড়ানো উপকূলের চার উপজেলার নারী-পুরুষ যুগযুগ ধরে পানির সংকটে ভুগছে। খুলনার ৩শ’ গ্রামের মানুষ বার মাসই বাড়ির আঙ্গিনায় সংরক্ষিত ট্যাঙ্কের বৃষ্টির পানিই পান করে। ভূ-গর্ভস্থ পানি পানের জন্য অযোগ্য হওয়ায় গভীর নলকূপ স্থাপন প্রক্রিয়া কখনই সফল হয়না। এ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকারের জন্য কোন সরকারই বিকল্প ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে খাবার পানির সংকট প্রতি বছরই তীব্র হচ্ছে। এ সংকট নিরসনের ডিসি সম্মেলনে দাবি তুলবেন খুলনার জেলা প্রশাসক।

শিবসা, কাজীবাছা, কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর নাব্যতা হ্রাস পাওয়ার পর মিঠে পানির সংকটে নানাবিধ সফল উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। মাছের বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়েছে। কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলায় ৬৭টি খাল ভরাট হওয়ায় মিঠে পানির উৎস্যগুলো বন্ধ হয়েছে। প্রতি বছর উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় এ জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে কর্পোরেট হাউজের পানি সরবরাহ করতে হয়। আইলা ও আম্ফানের সময় দাকোপ ও কয়রায় মিঠে পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ কাতর হয়ে পড়ে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, পাইকগাছার দেলুটি, কপিলমুনি, রাড়ুলী, লস্কর, শোলাদানা, গড়ইখালি, চাঁদখালি, হরিঢালি, লতা, গদাইপুর, কয়রার আমাদি, বাগালি, মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, কয়রা, উত্তর বেদকাশি, দক্ষিণ বেদকাশি, বটিয়াঘাটার সুরখালি, জলমা, বটিয়াঘাটা, দাকোপের বাজুয়া, দাকোপ, তিলডাঙ্গা, পানখালি, সুতারখালি, কামারখোলা, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ ও বানিয়াশান্তা ইউনিয়নে শুষ্ক মৌসুমের আট মাস খাবার পানির সংকট থাকে।

পাইকগাছার শামুকপোতা গ্রামে জুন-জুলাই মাসেও মিঠে পানি পাওয়া যায় না। জেলার উল্লিখিত ইউনিয়নগুলোর জনগোষ্ঠীর খাবার পানি নিশ্চিত করতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ৪০ হাজার ট্যাঙ্কি সরবরাহ করেছে। ট্যাঙ্কি পাওয়ার জন্য বিগত সরকারের আমলে জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশ ছিল একাধিক ব্যক্তির পক্ষে। ভিন্ন দর্শনের মানুষদের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। উপকূলের এসব স্থানে এক হাজার মিলিগ্রামের বেশি পানিতে লবণাক্ত হওয়ায় জেলা পরিষদ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন পুকুর খনন করে।

পানি নিশ্চিত করা সরকারি দপ্তরের রেকর্ডে বলা হয়েছে, দাকোপ উপজেলার বাজুয়া ইউনিয়নের ২টি গ্রামের ২৬টি গভীর নলকূপ ও দাকোপ ইউনিয়নে মাত্র ৩টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। লবণাক্ততার কারণে শিবসা ও পশুর তীরবর্তী বাকি ৭টি ইউনিয়নে গভীর নলকূপ স্থাপন সম্ভব হয়নি। শহরতলির জলমা ও বটিয়াঘাটা ইউনিয়নে পানির স্তর ২০ থেকে ২৫ ফুট নিচে নেমে গেছে। কয়রা উপজেলার আমাদি, বাগালি ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নে ভূ-নিম্নাস্থ মিঠে পানির সংকট থাকে বার মাসই।

উত্তর ও দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে ২০ শতাংশ, মহারাজপুর ও কয়রা ইউনিয়নে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন সফল হয়েছে। জেলার ৯ উপজেলার ৬৮টি ইউনিয়নে বৃহৎ জনগোষ্ঠী ২২শ’ নলকূপ থেকে ভূ-গর্ভের পানি পান করে। ২০২০ সালের পর থেকে জেলায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য নতুন কোন প্রকল্প নেওয়া হয়নি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-সহকারি প্রকৌশলী সুমন কুমার রায়, কয়রা উপজেলা প্রকৌশলী ইশতিয়াক আহমেদ, দাকোপ উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ও বটিয়াঘাটা উপজেলার উপ-সহকারী প্রকৌশলী রুনা আক্তার সুমি সংশ্লিষ্ট এলাকায় পানি সংকটের চিত্রতুলে ধরেন।

তারা বলেন, উপকূলবাসীর জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে রাখে। বার মাসই সংরক্ষিত পানি পরিবারের সদস্যরা পানি করে। কয়রার আদিবাসীরা আধুনিক পদ্ধতির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। মে-জুনের প্রথম সপ্তাহে পানির স্তর নেমে গেলে গভীর নলকূপ থেকে কাঙ্খিত পানি উত্তোলন হবে না।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন