আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ট ক্যারিয়ারদের কাছে এখনও জিম্মি রয়েছেন খুলনা নৌপরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরা। ২০১০ সাল থেকেই মোংলা বন্দরের জাহাজ থেকে পণ্য খালাশ নিয়ন্ত্রণ করছেন ৭/৮ জন ক্যারিয়ার। অভ্যুত্থানের পর তারা কিছুটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। গতবছর ক্ষমতাসীন কয়েক নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে আবারও পুরানো চেহারায় ফিরেছেন তারা। ফলে পণ্য পরিবহনের ভাড়া ও বিলম্ব মাসুল পাবার জন্য মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে কার্গো মালিকদের।
বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগের পুরানো সিন্ডিকেট ভাঙতে নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগের উদ্যোগ নেয় নৌপরিবহন মালিক গ্রুপ। কিন্তু আদালতে মামলা করে নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগের প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে মোংলা বন্দরে জাহাজ খালাশের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে পুরাতন সিন্ডিকেটের কাছে। এছাড়া নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগ বা সিন্ডিকেট ভাঙতে যারা কাজ করছেন, তাদের প্রশাসনিকসহ নানাভাবে হয়রানী করা হচ্ছে।
নৌপরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, মোংলা বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন খাতটি দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই খাতে বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ীদের সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনা। নৌপরিবহন ব্যবসায়ীদের সংগঠন খুলনা বিভাগীয় আভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন মালিক গ্রুপও গত ১৬ বছর ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাইদের নিয়ন্ত্রণে।
তারা জানান, মোংলা বন্দরের জাহাজ থেকে পণ্য খালাশের জন্য ২০১০ সালে ১৩ জন ক্যারিয়ার নিয়োগ দেন নৌপরিবহর মালিক গ্রুপের ওই সময়কার মহাসচিব ও সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম। এর মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া ও মারা যাওয়ার পর বর্তমানে ২৩নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মিনহাজ উজ জামান সজলের মেসার্স প্রমিজ ট্রেডার্স, শেখ জুয়েলের ঘনিষ্ট উজ্জল গাঙুলীর মেরিন শিপিংসহ ৯ জন ক্যারিয়ার জাহাজ খালাশ নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রায় দেড়দশক নৌপরিবহন মালিক গ্রুপে নির্বাচন না হওয়ায় ক্যারিয়ার পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ব্যবসায়ীরা জানান, বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাশের চুক্তি নেন ক্যারিয়াররা। ক্যারিয়াররা কার্গো ভাড়া নিয়ে জাহাজ থেকে পণ্য খালাশ করে খুলনা, নওয়াপাড়াসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পৌঁছে দেন। অনেক সময় পণ্য খালাশ করতে দেরি হয়। ক্যারিয়াররা জাহাজ মালিক ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে ভাড়া ও বিলম্ব ফি (ডেমারেজ) বাবদ কোটি টাকা আদায় করেন। কিন্তু কার্গো মালিকদের সেই টাকা প্রদান করেন না। এভাবে অন্যের কার্গো কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন ক্যারিয়াররা।
২০১৯ সালে আওয়ামী লীগ তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। ওই সময় ভাড়া প্রদান আরও কমিয়ে দেওয়া হয়। বিলম্ব মাসুল প্রদান করা হতো না। মালিক গ্রুপের একটি হিসাবে দেখা গেছে, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শুধু বিলম্ব মাসুল বাবদ সাধারণ কার্গো মালিকরা কার্গো মালিকদের কাছে প্রায় ১০ কোটি টাকারও বেশি বকেয়া রয়েছে। অভ্যুত্থানের পরও এ অবস্থা থেকে মুক্তি মেলেনি।
সূত্রটি জানায়, অভ্যুত্থানের পর ছাত্র সমন্বয়কদের সামনে রেখে নৌপরিবহন মালিক গ্রুপ দখল করে নেয় ব্যবসায়ীদের একটি অংশ। পরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রশাসক নিয়োগ করে নির্বাচন দেওয়া হয়। নির্বাচনে সাধারণ ব্যবসায়ীদের প্যানেলের সব পদে বিজয়ী হন। সভাপতি নির্বাচিত হন প্রবীণ ব্যবসায়ী সৈয়দ জাহিদ হোসেন, মহাসচিব হন মো. মফিজুর রহমান।
দায়িত্বগ্রহণ করেই তারা কার্গো মালিকদের বকেয়া পরিশোধসহ নানা অসঙ্গতি দূর করার উদ্যোগ নেন। পুরানো সিন্ডিকেট ভাঙতে নির্বাহী কমিটি সর্বস্মতিক্রমে নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। চলতি বছর ৩ জানুয়ারি ক্যারিয়ার নিয়োগের প্রথম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই দিনই এক ক্ষমতাধর নেতার নির্দেশে বিজ্ঞপ্তি নামিয়ে ফেলতে বাধ্য হন নৌপরিবহন মালিক গ্রুপের নেতারা।
বিএনপি সরকার গঠনের পর গত ৩ মার্চ ক্যারিয়ার নিয়োগের দ্বিতীয় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ৩১ মার্চ পর্যন্ত ক্যারিয়ার হতে ২৭ জন আবেদন করেন। কিন্তু সেই আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের আগেই গত ২ এপ্রিল ক্যারিয়ার নিয়োগে স্থগিতাদেশ চেয়ে আদালতে মামলা করেন ৬ জন ক্যারিয়ার। আদালত স্থগিত করলে পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। এতে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ক্যারিয়াররাই জাহাজ খালাশের সুযোগ আরও বাড়লো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কার্গো মালিক জানান, তিন ক্যারিয়ারের কাছে আমার ২৭ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে এই টাকা আর ফেরত পাব না। নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগ হলে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকতো, সিন্ডিকেট ভেঙে যেত। এতে সবার উপকার হতো।
আরেক নৌপরিবহন মালিক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতারা ক্যারিয়ার হওয়ায় পলাতক নেতাদের কার্গো বেশি ট্রিপ পায়। তাদের ভাড়ার টাকা নিয়মিত পরিশোধ করা হয়। যা হুন্ডির মাধ্যমে ভারতসহ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। অথচ আমরা দেড়-দুই মাস পর একটি ট্রিপ পাই, সেই ভাড়াও ঠিকমতো পাই না।’
সূত্রটি জানায়, মামলাকারী দু’জন মালিক গ্রুপের নির্বাহী কমিটির সদস্য। নির্বাহী কমিটির সভায় তারাই ক্যারিয়ার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবার তারাই মামলা করে এটা বন্ধ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে আগামী সাধারণ সভায় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে খুলনা বিভাগীয় আভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বর্তমান কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের পরই সবাই মিলে নৌ পরিবহন ব্যবসায় শৃংখলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। সব কার্গো মালিক যাতে সমান ট্রিপ পায়, এজন্য আমরা সমবন্টন রীতি চালু করেছি। বিলম্ব মাসুল আদায় শুরু করেছি। খুব শিগগিরই এটা মালিকদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই কাজে প্রতিকূলতা অনেক বেশি।’
তিনি বলেন, গত ১৫ বছরের মনোপলি ক্যারিয়ার ব্যবসা ভাঙতে নতুন ক্যারিয়ার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মামলা করে সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আগামী ২৫ এপ্রিল সাধারণ সভা আহ্বান করা হয়েছে। সেখানে সাধারণ সদস্যদের মতামত নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
খুলনা গেজেট/এনএম

