বৃহস্পতিবার । ২৬শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১৩ই ফাল্গুন, ১৪৩২

খাল খনন, সড়ক ও ড্রেন নির্মাণের চেক নিতে ঘুষ বাধ্যতামূলক!

নিজস্ব প্রতিবেদক

খুলনা নগরজুড়ে চলছে খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) উন্নয়ন কাজ। নির্মাণ কাজের পেছনে প্রতিবছর কেসিসি’র খরচ হচ্ছে প্রায় শত কোটি টাকা। কাজের এই বিল তুলতে আধা শতাংশ হারে ঘুষ দিতে হচ্ছে ঠিকাদারদের। গত তিন মাস ধরে চলছে এই অবস্থা!

ভুক্তভোগীরা জানান, শুনতে অবাক লাগলেও নগর ভবনে এটি ওপেন সিক্রেট। কেসিসিতে কর্মরত প্রকৌশলী, কার্য সহকারী, অফিস সহায়ক ও পিওন, সবাই এটা জানেন। চেক নিতে বাধ্য হয়েই তারা অতিরিক্ত লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিচ্ছেন।

তারা জানান, কেসিসির শীর্ষ কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে পূর্ত বিভাগে এই টাকা জমা রাখা হয়। পরে আরেক শীর্ষ প্রকৌশলীর মাধ্যমেই নগদ টাকা লেনদেন হয়। টাকা দেওয়ার পরদিন চেক হাতে পান ঠিকাদাররা। কাংখিত টাকা না দেওয়ায় বিলের জন্য মাসের পর মাস ঘুরছেন অনেকে।

কেসিসিতে কাজ করা ঠিকাদারররা জানান, কাজ শেষে বিল তৈরি ও উত্তোলনের জন্য একটি নির্ধারিত অংকের টাকা অফিস খরচ হিসেবে ব্যয় করা হয়। এটি দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। বিগত সব মেয়রের সময়ই গোপনে সমঝোতার ভিত্তিতে এই লেনদেন হয়েছে। এটা নিয়ে তাদের কোনো অভিযোগ নেই।

তবে হাতে গোনা কয়েকজন প্রকৌশলী এবং সরকারি কর্মকর্তা এই টাকা নিতেন না। বিশেষ করে কেসিসির বর্তমান ও বিদায়ী কয়েকজন প্রধান নির্বাহী, সচিব, ম্যাজিস্ট্রেট কোনো ধরনের অনৈতিক লেনদেনে জড়াননি। চেক নিতে নির্ধারিত হারে টাকা বাধ্যতামূলক ঘুষ দিতে হয়নি কাউকে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঠিকাদার জানান, গত নভেম্বর মাস থেকে ঘুষের এই ধারা শুরু হয়। পুরো নভেম্বর এবং ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ পর্যন্ত কেউ কোনো বিল পাননি। নানা অজুহাতে বিল ফিরিয়ে দেওয়া হয়। চলতি বিলের টাকা না পেয়ে অনেকের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তখন শীর্ষ প্রকৌশলীর মাধ্যমে আধা শতাংশ ঘুষ দিয়ে বিল ছাড়ানো শুরু হয়।

নগরীর একটি নদী ও খাল খননের সঙ্গে জড়িত এক ঠিকাদার বলেন, বিলের জন্য বাকি কাজ শেষ করতে পারছিলাম না। পরে দু’টি বিলের জন্য আধা শতাংশ হারে বাড়তি টাকা দিয়ে চেক নিতে হয়েছে।

সড়ক নির্মাণের কাজ করা আরেক ঠিকাদার জানান, “তিনটি বিল নিয়ে ঘুরছিলাম। পরে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি বিল ছাড়াতে হয়েছে। পরের দুটি বিলের জন্য আরও দুই লাখের মতো খরচ হয়েছে।” তিনি বলেন, “খুশি হয়ে কিছু দিলে খারাপ লাগে না। কিন্তু গলায় পাড়া দিতে এভাবে টাকা আদায় আগে কখনো হয়নি। নতুন প্রশাসকের কাছে আমাদের দাবি, তদন্ত কমিটি গঠন করে এই টাকা ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।”

কেসিসির বেশ কয়েকজন প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে চেক নেওয়ার জন্য বাড়তি ঘুষের সত্যতা পাওয়া গেছে। তারা কেউ নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। কেসিসির বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তারাও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং ক্ষুব্ধ বলে প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন।

তারা জানান, সবচেয়ে ছোট বিল হয় কেসিসির যান্ত্রিক বিভাগে। সাধারণত গাড়ির চাকা, নাট-বোল্ট কেনার জন্য আগাম খরচ করে পরে বিল তুলতে হয়। মাত্র ৩ লাখ টাকার সেই বিলেও আধা শতাংশ হারে ঘুষ দিতে হয়েছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে জানা গেছে, নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডের সড়ক ঝাড়ু দিতে শলা কেনা হয়। গতবছর ৪ হাজার কেজি ঝাড়ুর শলা কেনা হয়েছে। এর প্রথম ধাপের ১ লাখ ৩৩ হাজার টাকার বিলের ফাইল তৈরি করা হয় গত ৫ জানুয়ারি। সামান্য এই টাকার বিলও ঘুরছে দেড় মাস ধরে।

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, এ ধরনের কথা গত ৩০ বছরে শুনিনি। অবিলম্বে এটি বন্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটি গঠন করে জড়িতদের খুঁজে বের করা দরকার।

এ ব্যাপারে কেসিসির প্রশাসক মো. মোখতার আহমেদের বক্তব্য নিতে দপ্তরে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন