খুলনায় নানা হালিমের কদর আলাদা। ইফতারে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকে এ খাবার। এর স্বাদ গ্রহণ করেননি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। গত ৩০ বছরের অধিক সময় ধরে নগরীর সাউথ সেন্ট্রাল রোডস্থ পাইওয়নিয়ার মহিলা মহাবিদ্যালয়ের সামনে বিক্রি হয়ে আসছে এই হালিম। খাসির মাংস আর গাওয়া ঘিয়ের সংমিশ্রণে তৈরি এ খাবার কিনতে দুপুর থেকে ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে থাকে।
নানা নামে খ্যাত হযরত আলী ৮১ বছরে পা দিয়েছেন। রমজান এলেই নানাকে স্মরণ করেন খুলনার সব বয়সের মানুষ। প্রতিদিন ৪ থেকে ৫টি ডেগে ১০০ থেকে দেড়শ’ কেজি হালিম রান্না করেন তিনি। গতকাল শুক্রবার দুপুরে কথা হয় তার সাথে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন তিনি। রোজাদারদের কথা চিন্তা করে রমজান মাসজুড়ে হালিম তৈরি ও বিক্রি করছেন। সব বয়সি ক্রেতারা এসে নানা বলে ডাক দেয় তাকে। এতেই যেন বুক ভরে যায় তার।
নানা খ্যাত হযরত আলী জানায়, ‘এক সময় সৈনিক হিসেবে জীবন যাপন শুরু করেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। দেশ স্বাধীনের পর চাকরিতে ফিরে না গিয়ে বাড়িতে চলে আসেন হযরত আলী। এরপর যোগদেন ক্রিসেন্ট জুট মিলে। সেখান থেকে ঢাকায় চলে যান। আবার ফিরে আসেন খুলনার শিরোমনিতে। এরপর বাদামতলা চক্ষু হাসপাতালে। চট্টগ্রাম গোল্ডলিফ কোম্পানিতে কিছুদিন চাকরি করার পর খুলনায় ফিরে এসে পাইওনিয়ার মহিলা মহাবিদ্যালয়ে মাষ্টাররোলে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নেন। বেতন যা পেতেন তা দিয়ে সংসার ঠিক মতো চলত না। তাই বাড়তি আয়ের জন্য প্রথমে ভ্যানে করে হালিম বিক্রি শুরু করেন। পরবর্তীতে হালিমের সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়লে ১৯৯৩ সাল থেকে স্থায়ীভাবে এ ব্যবসা করতে থাকেন। বয়স বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে শুধুমাত্র রমজান মাসে রোজাদারদের তৃপ্তি মেটাতে হালিম বিক্রি করছেন।
খাবারের মান ঠিক রাখতে এখনও হযরত আলী নিজ হাতেই রান্না করেন। দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়লেও হালিমের ওপর কোন প্রভাব পড়েনি। বাড়ানো হয়নি কোন দাম। নানা আকারের মাটির পাত্রে ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা মূল্যে হালিম পাওয়া যায় তার বিক্রয় কেন্দ্রে। প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে ইফতারের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত চলে বিক্রি। তবে প্রস্তুতি শুরু হয় সকাল থেকে। সাতজন বাবুর্চিসহ ১১ জন কাজ করেন তার সাথে।
শুক্রবার দুপুর সাড়ে ৩ টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, বড়ো বড়ো ডেগ হাড়ি ভর্তি হালিম নিয়ে বসেছেন অস্থায়ী দোকানে। টেবিলে সাজানো বিভিন্ন আকারের মাটি ও প্লাস্টিকের পাত্র। তখনও ভিড় শুরু হয়নি। দু’জন ক্রেতা চাহিদা অনুযায়ী কিনে নিয়ে যান নানার হালিম। নিজ হাতে টাকা বুঝে নিচ্ছেন হযরত আলী।
নানাকে সহায়তাকারী মোঃ হাবিব পেশায় বাবুর্চি। বছরের অন্য সময়ে বিভিন্নস্থানে রান্না বান্নার কাজ করেন। শুধুমাত্র রমজান মাস এলেই হযরত আলীর (নানা) দোকানে কাজ করেন। গত ২৬ বছর ধরে তার সাথে রয়েছেন তিনি।
শিপইয়ার্ডে কর্মরত মোঃ শামীম জানান, ‘গত কয়েক বছর ধরে এখান থেকে হালিম কিনছেন। নানার হাতে জাদু আছে। ইফতারে এ খাবারটি না থাকলে তার পরিবারের চলে না। রোজার প্রথমদিনে কিনতে এখানে এসেছিলেন কিন্তু না পেয়ে চলে যান। তাই শুক্রবার সকাল সকাল এসেছেন যাতে খালি হাতে ফিরতে না হয়।’
মনিরুল হক নামের এক ব্যবসায়ী হালিম কিনতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘নানা হালিমের বিশেষত্ব খাসির মাংস ও ঘি এর সংমিশ্রণে এক ভিন্ন স্বাদ। এমন সুস্বাদু হালিম খুলনায় খুব কমই পাওয়া যায়। প্রতিবছর রমজানে ইফতারির জন্য দুই-তিন দিন নানা হালিম নিয়ে যান তিনি। বাড়ির সবাই খুব পছন্দ করে এই হালিম।’
খুলনা গেজেট/এনএম

