ফুলের রাজধানীখ্যাত যশোরের গদখালীর ফুল চাষীরা নতুন মৌসুম ঘিরে স্বপ্ন আশায় বুক বেঁধেছেন। সামনে পাঁচ দিবসকে কেন্দ্র করে শত কোটি টাকার ফুল বিক্রির আশা চাষী ও বিক্রেতাদের। বাজারে উঠতে শুরু করেছে বাহারি রঙের ফুল। ব্যবসায়ীরা এ সব ফুল নিয়ে ছুটছেন দেশের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
গদখালীর ফুলের সৌন্দর্য্য ছড়িয়ে পড়েছে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও। গদখালী সহ আশেপাশের প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমিতে নানা জাতের ফুলের চাষ হয়। এ অঞ্চলের চাষীদের উৎপাদিত প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ফুল চাষী ও ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে পৌঁছে যায় ফুল প্রেমীদের হাতে। গদখালীতে ফুলের অর্থনৈতিক বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি এখানকার পর্যটনকে ঘিরে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।
এখন শুধু আর গদখালী নয়, আশপাশের আরও কয়েকটি ইউনিয়নে ফুল চাষের বিপ্লব ঘটেছে। এই অঞ্চলে ছয় হাজারের বেশি চাষী দেড় হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষের সাথে জড়িত। ঝিকরগাছার পানিসারায় বাণিজ্যিক ভাবে প্রথম ফুল চাষ শুরু করেছিলেন পানিসারা গ্রামের কৃষক শের আলী সরদার।
চার দশকে সম্প্রসারিত হওয়া ফুলচাষ গদখালীকে এনে দিয়েছে দেশের ‘ফুলের রাজধানী’র খ্যাতি। এখন এই অঞ্চলের কৃষকরা নিত্যনতুন জাতের ফুলচাষে নজির স্থাপন করে চলেছেন। গদখালীর যেদিকেই চোখ যায়, চোখে পড়ে ফুলের বাগান। বিশেষ করে গোলাপ, গাঁদা, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস, জারবেরা, অর্কিড, পাতাবাহারসহ অসংখ্য ফুলের বাগান। এর বাইরে চোখে পড়ে পলি হাউস বা ফুলচাষের বিশেষ ঘর। এসব ঘরে চাষ হচ্ছে জারবার ফুল, বাজারে যার চাহিদা অনেক বেশি।
গদখালির ফুল উৎপাদক ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম জানান, “চার দশকেরও বেশি সময়ে গদখালি এলাকার চাষীদের ফুলের বাজার বছরে ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। গদখালীতে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকার ফুল ক্রয়-বিক্রয় হয়।”
যশোর-বেনাপোল মহাসড়কে রাস্তার দু’পাশে গদখালি বাজারে প্রতিদিন সকালে শুরু হয় ফুলের পাইকারি বাজার। চাষীরা তাদের জমি থেকে উৎপাদিত ফুল নিয়ে আসেন ফুলের পাইকারি বাজারে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন ফুল কেনার জন্য।
মহান বিজয় দিবস, বড়দিন, ইংরেজি নববর্ষ, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস, বসন্তবরণ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বাংলা নববর্ষে ফুলের বেচাকেনা বেড়ে যায়। এই দিবসগুলো ঘিরেই বেড়েছে ফুল চাষীদের ব্যস্ততা। রজনীগন্ধা, গোলাপ, জারবেরা, গাঁদা, গ্লাডিওলাস, জিপসি, চন্দ্রমল্লিকাসহ নানান প্রজাতির ফুলচাষিরা ক্ষেত পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
ঝিকরগাছার কুলিয়া গ্রামের চাষী আরিজুল ইসলাম। এক বিঘা জমিতে রাজনীগন্ধা ফুলের চাষ করেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এরই মধ্যে ফুল বিক্রি করেছেন প্রায় দুই লাখ টাকার। আশা করছেন, আরও প্রায় তিন লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন।
গদখালি ফুল চাষী ও ফুল ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবু জাফর জানান, “শীতের শুরু থেকেই ফুলের বাজার জমতে শুরু করেছে। চাষীরা তাদের শ্রমের ফসল ফুল বাজারে তুলতে শুরু করেছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে চাষীরা ভালো দাম পাবে বলে আশা করছি।” সব মিলিয়ে তাদের আশা, মৌসুমের পাঁচটি দিবসকে ঘিরে তারা শতকোটি টাকার ফুল বেচাকেনা করতে পারবেন।
ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ নূরুল ইসলাম বলেন, “মৌসুমের শুরু থেকেই ফুলের বাজার ধরতে চাষীরা সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছেন। ফুল চাষের ক্ষেত্রে ছত্রাকসহ যে ধরনের রোগ-বালাইয়ের সমস্যা দেখা দেয়, তার জন্য সব সময়ই তারা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করছেন। বাজার পরিস্থিতিও ভালো। আশা করা হচ্ছে, গদখালির চাষিরা এই মৌসুমে যথেষ্ট লাভবান হতে পারবেন।”
খুলনা গেজেট/এনএম
