মেসিকে থামাতে টুখেলের ‘নীল নকশা’

ক্রীড়া প্রতিবেদক

লিওনেল মেসিকে থামানোর ফর্মুলা খুঁজতে গিয়ে দুই দশকে কত কোচ যে মাথা ঘামিয়েছেন, তার হিসাব রাখা কঠিন। কেউ ব্যক্তিগত মার্কিং করেছেন, কেউ চারজনকে দিয়ে ঘিরে রেখেছেন, কেউ আবার পুরো দলকেই নামিয়ে এনেছেন নিজেদের অর্ধে। তবু শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে, মেসি এক মুহূর্তের জাদুতেই ভেঙে দিয়েছেন সব হিসাব। তাই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের আগে টমাস টুখেলের সবচেয়ে বড় প্রশ্নও একটাই—মেসিকে কীভাবে থামাবেন?

উত্তরটা হয়তো একজন খেলোয়াড়ের কাছে নেই। সেটি লুকিয়ে আছে পুরো দলের কৌশলে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, টুখেলের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু মেসিকে আটকানো নয়; তাকে এমন জায়গায় খেলতে বাধ্য করা, যেখানে তিনি ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারবেন না।

চলতি বিশ্বকাপে মেসি ছয় ম্যাচে আট গোল করে আর্জেন্টিনাকে টেনে তুলেছেন শেষ চারে। তবে সংখ্যার চেয়েও ভয়ংকর তার প্রভাব। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে গোল করতে পারেননি, কিন্তু কর্নার থেকেই তৈরি করেছিলেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের গোল। পুরো ম্যাচে খুব কম দৌড়ালেও ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় উপস্থিত হয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দেন তিনি। দ্য টাইমসের বিশ্লেষণ বলছে, এখনকার মেসি গতি দিয়ে নয়, সময়জ্ঞান, অবস্থান নির্বাচন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করেন। তাহলে টুখেলের নীল নকশা কী হতে পারে?

প্রথম পরিকল্পনা হতে পারে, মেসিকে বল পাওয়ার আগেই বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। স্কাই স্পোর্টসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের সঙ্গে মেসির সংযোগ কেটে দিতে পারলে তার প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব। সে ক্ষেত্রে ডেকলান রাইসকে ভেতরের অবস্থানে রেখে মেসির দিকে যাওয়া পাসের লাইন বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে ইংল্যান্ড। একই সঙ্গে জুড বেলিংহাম ও অন্য মিডফিল্ডারদেরও বল হারানোর পর দ্রুত ভেতরে নেমে এসে জায়গা কমিয়ে দিতে হবে।

দ্বিতীয় পরিকল্পনা হতে পারে, একক ম্যান-মার্কিংয়ের বদলে ‘জোনাল ফাঁদ’ তৈরি করা। কারণ মেসিকে একজন ডিফেন্ডারের হাতে তুলে দেওয়া প্রায়ই উল্টো ফল দেয়। তিনি একজনকে কাটিয়ে উঠতে পারলেই পুরো রক্ষণ ভেঙে পড়ে। তাই সুইজারল্যান্ড যেভাবে নিজেদের রক্ষণভাগকে কমপ্যাক্ট রেখে মাঝখানের ফাঁকা জায়গা বন্ধ করেছিল, সেই কৌশলই অনুসরণ করতে পারে ইংল্যান্ড। বল পেলে মেসির চারপাশে দ্রুত দুই বা তিনজন খেলোয়াড় চলে আসবেন, কিন্তু কেউই অযথা ট্যাকলে ঝাঁপিয়ে পড়বেন না। এটিই হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। অতীতে হোসে মরিনহোর ইন্টার মিলান, দিয়েগো সিমিওনের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ কিংবা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড—সবাই মেসিকে থামাতে একই নীতি অনুসরণ করেছিল। তাকে সময় দেওয়া যাবে না, আবার অযথা ট্যাকলে গিয়েও জায়গা ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থেকে তার পাসের পথ বন্ধ করতে হবে।

টুখেলের আরেকটি ভাবনা হতে পারে মেসিকে রক্ষণেও ব্যস্ত রাখা। মেসি এখন আগের মতো নিয়মিত প্রেসিং করেন না। তাই ইংল্যান্ড যদি ডান প্রান্ত দিয়ে ধারাবাহিক আক্রমণ গড়ে তুলতে পারে, তাহলে আর্জেন্টিনা অধিনায়ককে আরও বেশি নিচে নেমে রক্ষণে সাহায্য করতে হতে পারে। এতে আক্রমণে তার শক্তি কিছুটা হলেও কমে যেতে পারে।

তবে টুখেল নিজেও জানেন, শুধু মেসিকে নিয়ে ভাবলে বিপদ বাড়তে পারে। কারণ আর্জেন্টিনার শক্তি শুধু একজন ফুটবলারের ওপর নির্ভর করে না। এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল, ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা হুলিয়ান আলভারেজরা মুহূর্তেই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। তাই ইংল্যান্ডের কৌশল হবে ভারসাম্যপূর্ণ। মেসিকে সম্মান দেখাতে হবে, কিন্তু তাকে আটকাতে গিয়ে অন্যদের জন্য ফাঁকা জায়গা তৈরি করা যাবে না।

টুখেল অবশ্য ম্যাচের আগে নিজের পরিকল্পনার পুরোটা প্রকাশ করেননি। তিনি শুধু বলেছেন, বড় ম্যাচে হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহামের মতো নেতৃস্থানীয় ফুটবলারদের প্রভাবই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড শুধু রক্ষণাত্মক চিন্তায় আটকে থাকতে চায় না; তারা নিজেদের আক্রমণ দিয়েও আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখতে চায়। কিন্তু সব পরিকল্পনার মাঝেও একটি বাস্তবতা রয়ে যায়। মেসিকে পুরো ৯০ মিনিট আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব। তিনি এমন একজন ফুটবলার, যিনি পুরো ম্যাচে নীরব থেকে মাত্র এক মিনিটের জাদুতেই ফল বদলে দিতে পারেন।

তাই আটলান্টার সেমিফাইনালে টুখেলের নীল নকশার মূল কথা হয়তো একটাই—মেসিকে থামানো নয়, তার প্রভাব যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। কারণ ফুটবল ইতিহাস বারবার শিখিয়েছে, মেসিকে পুরোপুরি বন্দি করার পরিকল্পনা কাগজে লেখা যায়, কিন্তু মাঠে বাস্তবায়ন করা যায় খুব কমই।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন