সোমবার । ৮ই জুন, ২০২৬ । ২৫শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

এবারও মেসির হাতেই বিশ্বকাপ!

ক্রীড়া প্রতিবেদক

‘অমরত্বের প্রত্যাশা নেই, নেই কোন দাবি-দাওয়া, এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাওয়া’— কাতার বিশ্বকাপের আগে জনপ্রিয় শিল্পী কবির সুমনের এই গানের মতোই ছিল লিওনেল মেসির চাওয়া। ব্যক্তিগত সবকিছু জিতলেও বিশ্বকাপের ছোঁয়া তখন ছিল অধরা। অবশেষে ২০২২ বিশ্বকাপে সেই স্বাদ পেলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।

মেসির এই স্বাদকে অমরত্বের সঙ্গে তুলনা করেছেন জনপ্রিয় ধারাভাষ্যকার পিটার ডুরি। ফ্রান্সকে হারিয়ে ৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনার তৃতীয় বিশ্বকাপ নিশ্চিত হতেই তার কণ্ঠে শোনা যায়, ‘শেষ চূড়া জিতে অমরত্বের স্বাদ পেয়েছে মেসি।’

তাহলে ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে আজন্ম স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পরও কেন থামলেন না মেসি? ৪ বছর পর কেন-ই-বা নামছেন আরেকটি বিশ্বকাপে। সবকিছুর উত্তর যেন ‘ক্ষুধা’ শব্দটিতে। ‘হে মহাজীবন’ কবিতায় কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তো বলেই গেছেন ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’।

ক্ষুধা শেষ হলে সাবেক সতীর্থ আনহেল দি মারিয়ার সঙ্গেই নিজের বুটজোড়া তুলে রাখতেন তিনি। ক্যারিয়ারের শেষটা তাই রাঙানোর অপেক্ষায় আছেন ৮বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী। ‘শেষ রাতে ওস্তাদের মাইর’ দেখানোর প্রতীক্ষা যারে বলে। ৩৮ বছর বয়সী শিষ্য তা দেখাতে পারবেন এমন বিশ্বাস আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ পাবলো আইমারেরও। মেসির শৈশবের আইডল বলেছেন, ‘সর্বশেষ মেসিই সেরা মেসি।’

বয়স হওয়ার কারণে বনের রাজা খ্যাত সিংহ যেমন করেন, ঠিক তেমনি কৌশলে পরিবর্তন এনেছেন মেসিও। মাঠে কম দৌড়ে খেলা নিয়ন্ত্রণে মনোযোগী এখন তিনি। ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে গেল কয়েক বছর ধরে সেই কাজটা করে আসছেন তিনি। মাঠের পজিশনেও কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন। এখন মাঝমাঠ নয়, একটু উপরেই খেলেন তিনি। যেন জমানো শক্তিতে ‘ঝোপ বুঝে কোপ মারতে’ পারেন ইন্টার মায়ামির অধিনায়ক।

বিশ্বকাপের জন্যই নিজেকে প্রস্তুত করেছেন মেসি, এমনটা তার মুখে শোনা না গেলেও সেটা নিশ্চিত করেছেন রদ্রিগো দি পল। দল ঘোষণার আগে তার জাতীয় ও ক্লাব সতীর্থ মিডফিল্ডার বলেছেন, ‘আমরা বিশ্বকাপের জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছি। গত দুই-তিন মাস ধরে ক্লাবের অনুশীলনের পাশাপাশি আমরা প্রতিদিন আলাদা অনুশীলন করছি। সেরা ফিটনেসের জন্যই লিও এবং আমি সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিচ্ছি। বিশ্বকাপের ভাবনা ছাড়া কি আর থাকা যায়।’

বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাওয়ায় এখন মানসিকভাবে চাপহীন এবং নির্ভার মেসি। সঙ্গে তার ওপর থেকে অনেকটাই নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছেন কোচ লিওনেল স্কালোনিও। কাতার বিশ্বকাপে খেলা তার অন্য শিষ্যরা এখন তরুণ থেকে অভিজ্ঞ হয়েছে। শুধু অভিজ্ঞই নন, ইউরোপীয় ফুটবল মাতাচ্ছেনও তারা। অভিজ্ঞতার প্রমাণ বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে দিয়েছেন তারা। কনমেবলের বাছাইপর্বে সর্বোচ্চ ৩৮ পয়েন্ট এনে দিয়ে। বড় উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, সর্বশেষ কোপা আমেরিকার ফাইনালে অর্ধেকের মতো সময় মেসিকে ছাড়াই খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা। ২০২২ বিশ্বকাপে খেলা ১৬ জন এবারও স্কোয়াডে আছেন। গতবারের বিশ্বকাপ খেলা খেলোয়াড়দের ধরে রাখার দিক থেকে সর্বোচ্চ। নিজেদের বোঝাপড়াটা তাই আরও পাকাপোক্তই হয়েছে।

মেসিদের বিশ্বকাপ ধরে রাখতে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্রে তাদের পারফরম্যান্স। সর্বশেষ কোপা আমেরিকায় আলবিসেলেস্তরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশেই। দলের বড় সুপারস্টার মেসি তো গত ৩ বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে খেলছেন। গত বছর ইন্টার মায়ামিতে নিয়ে এসেছেন দি পলকেও। তাতে কিছুটা বলা যায় ‘ঘরের মাঠেই’ খেলবেন মেসি-দি পলরা।

ক্ষুধা কীভাবে নিবারণ করতে হয় তা ভালো জানেন মেসি। তা না হলে ফুটবলের অধিকাংশ রেকর্ডে তার নাম থাকার কথা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকো বিশ্বকাপে তালিকাটা আরও দীর্ঘ করার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি। চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে বিশ্বের প্রথম অধিনায়ক হিসেবে দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড গড়বেন তিনি। ইতিমধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৬ ম্যাচ খেলা মেসি এবারের বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ডটাও নিজের করে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। ৪ গোল করতে পারলেই জার্মানির সাবেক ফরোয়ার্ড মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড নিজের করে নেবেন মেসি।

বিশ্বকাপ জিততে পারলে আর্জেন্টিনার সঙ্গে নিজেও রেকর্ডের ছোট্ট তালিকায় জায়গা পাবেন মেসি। এখন পর্যন্ত টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ড আছে শুধু ইতালি ও ব্রাজিলের। ইতালির ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালের বিপরীতে ব্রাজিল জিতেছে ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপে। আর মেসি জায়গা পাবেন টানা দুই বিশ্বকাপ জেতা খেলোয়াড়দের তালিকায়। এখন পর্যন্ত ব্রাজিল-ইতালি মিলিয়ে ১৮ জন জিতেছেন। এর মধ্যে ‘কালা মানিক’ পেলেও টানা দুইবারের সঙ্গে বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে সর্বোচ্চ ৩ বার বিশ্বকাপ জিতেছেন।

কীর্তি গড়ার নজির তাই মেসির সামনে আছেই। আরও কিছু নজির তাকে বিশ্বকাপ জয়ের অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে। তার সঙ্গে বার্সেলোনায় জুটি বেঁধে কখনোই চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে না পারা উসমান দেম্বেলে পিএসজির হয়ে টানা দুইবার ট্রফি জিতেছেন। অথচ, মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফি জেতার জন্যই চাঁদের হাট বসিয়েছিল ফ্রান্সের ক্লাবটি। সেই চাঁদের হাটে ছিলেন ‘দ্বিতীয় ঘর’ বার্সা ছেড়ে কিলিয়ান এমবাপ্পে-নেইমারের সঙ্গে জুটি বাঁধা মেসি। ক্লাব ইতিহাসের ৫৫ বছরের মধ্যে ২০২৫ সালে প্রথমবার জিতেছিল পিএসজি। এ বছর আর্সেনালকে হারিয়ে দ্বিতীয়টি জিতেছে তারা।

সময়ের হিসেবে আর্জেন্টিনার তৃতীয় শিরোপাও অনেকটা একইভাবে আসে। সর্বশেষ শিরোপা জিততে ৩৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের। এ তো গেল ফুটবলের, চলুন ক্রিকেটের গল্পটাও মিলাই। মেসি যেমন ফুটবলের ‘গোট’ ঠিক তেমনি ক্রিকেটে বিরাট কোহলি। দেশের হয়ে সবকিছু জিতলেও আইপিএলের ট্রফিটায় চুমু এঁকে দেওয়া হচ্ছিল না কোহলির। ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে সেই অপেক্ষা ফুরালেন ভারতীয় কিংবদন্তি। ২০২৫ আইপিএলে রয়্যাল চালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে শুধু প্রথমটাই জিতেননি, এ বছর ট্রফিটা ধরে রেখেছে তার দল।

দেম্বেলে-কোহলির পর তাই পালাটা এবার মেসির। সঙ্গে পিএসজি-বেঙ্গালুরুর মতো লক্ষ্য থাকছে আর্জেন্টিনারও! আত্মবিশ্বাসী আর্জেন্টাইন কিংবদন্তিও, ‘আমরা ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন, ধরে রাখার সুযোগ পাওয়াটা তাই দারুণ এক ব্যাপার। জাতীয় দলের হয়ে খেলা সবসময় স্বপ্নের, বিশেষ করে অফিসিয়াল টুর্নামেন্টগুলোতে। আশা করি, ঈশ্বর আমাকে আরও একবার এমনটা করার সুযোগ দেবেন।’

মেসি বিশ্বকাপ জিতবেন মনে করেন পাবলো জাবালেতাও। আর্জেন্টিনার সাবেক ডিফেন্ডার বলেছেন, ‘আমাদের মেসির খেলা উপভোগ করা উচিত। কারণ এটিই হতে পারে তার শেষ বিশ্বকাপ। আশা করি, ম্যাচ এবং বিশ্বকাপ জয়ের জাদুকরী মুহূর্ত তার মধ্যে এখনও বাকি আছে।’

অনেক অসম্ভবকে যেহেতু সম্ভব করেছেন মেসি, এবারও পারবেন এমন বিশ্বাস তার ভক্ত-সমর্থকদের! আর কথায় আছে বিশ্বাসে মেলায় বস্তু।

খুলনা গেজেট/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন