বৃহস্পতিবার । ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ২২শে মাঘ, ১৪৩২
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

ভারতের সঙ্গে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা পাকিস্তানের, আইসিসির ক্ষতি ৬ হাজার কোটি টাকা

ক্রীড়া প্রতিবেদক

একজন ক্রিকেটারকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত যে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অর্থনীতিতে বড়সড় ঢেউ তুলতে পারে- সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। জাতীয় দলের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে আইপিএলের একটি সিদ্ধান্ত এখন কেবল ক্রিকেট নয়, কূটনীতি ও বাণিজ্যিক স্বার্থের আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নিলামে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স মোস্তাফিজকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নিলেও পরে তাকে ছেড়ে দেয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক চাপ ছিল- এমন আলোচনা বিভিন্ন মহলে রয়েছে। ফলে মোস্তাফিজের চুক্তির পুরো অর্থই কার্যত লোকসান হয়েছে বলে ধরা হচ্ছে। তবে ঘটনাটি এখানেই থেমে থাকেনি।

এই ইস্যুকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ক্রিকেট সম্পর্কের টানাপোড়েনের কথা সামনে আসে। এর জেরে বাংলাদেশ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা দেয়—যে টুর্নামেন্ট আয়োজনের কথা ভারত ও শ্রীলঙ্কায়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন পাকিস্তানও প্রথমে বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেয়। যদিও পরে তারা জানায়, পুরো টুর্নামেন্ট নয়, কেবল ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কট করবে।

মোস্তাফিজের ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতি যেখানে ৯ কোটির কিছু বেশি, সেখানে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাণিজ্যিক কাঠামোয় অনেক বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। আধুনিক ক্রিকেট কেবল মাঠের লড়াই নয়; এটি এখন সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং বৈশ্বিক দর্শকসংখ্যা নির্ভর বিশাল শিল্প।

বিশেষ করে বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে কিছু ম্যাচ থাকে ‘হাই ভ্যালু ইভেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচকে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বৈরথ ধরা হয়। বাজার বিশ্লেষকদের রক্ষণশীল অনুমান অনুযায়ী, সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন, টিকিট, স্পনসরশিপ ও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড মিলিয়ে একটি ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৬ হাজার কোটির বেশি।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের সময় মাত্র ১০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন স্লট বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৪০ লাখ ভারতীয় রুপিতে। একটি ম্যাচ থেকেই বিজ্ঞাপন বাবদ প্রায় ৩০০ কোটি রুপি আয় হয়- এমন ধারণা রয়েছে।

এই ধরনের ম্যাচ না হলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সম্প্রচার স্বত্ব কিনে নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা আগেই বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে আইসিসির কাছ থেকে টুর্নামেন্টের স্বত্ব নেয়। সেই বিনিয়োগের বড় অংশই ওঠে উচ্চ দর্শকসংখ্যার ম্যাচ থেকে। ফলে নির্ধারিত ম্যাচ বাতিল বা বর্জন হলে রাজস্ব কাঠামোয় চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

বিশ্বকাপের সম্প্রচার স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি জিওস্টার আগেই আর্থিক ক্ষতির প্রসঙ্গ তুলেছে বলে জানা গেছে। বড় ম্যাচ বাতিল হলে আইসিসির ওপর ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিগত চাপ বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের একটি গড় বাণিজ্যিক মূল্য নির্ধারিত থাকে, যা শত কোটি রুপির ঘরে। কিন্তু সব ম্যাচ সমান নয়—কিছু ম্যাচের মূল্য অন্যগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি। ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এই ম্যাচ না হলে শুধু তাৎক্ষণিক আয় নয়, স্পনসরদের ব্র্যান্ড এক্সপোজার ও চুক্তিভিত্তিক লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে আইসিসি, সংশ্লিষ্ট বোর্ড ও সম্প্রচার অংশীদারদের মধ্যে জটিল আর্থিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ না নিলে তাদেরও আর্থিক ক্ষতি কম নয়। আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ ফি, সম্প্রচার আয়ের ভাগ, স্পনসর উপস্থিতি ও বৈশ্বিক প্রচারণা- সব মিলিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ জড়িত থাকে। একটি বড় টুর্নামেন্ট মিস করা মানে কয়েক কোটি ডলারের সম্ভাব্য আয় হারানো।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখাচ্ছে, আধুনিক ক্রিকেট কেবল ব্যাট-বলের লড়াই নয়; এটি কূটনৈতিক সম্পর্ক, করপোরেট বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক দর্শকবাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একজন খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সিদ্ধান্তও তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর্থিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন