বান্দার হকের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হক হলো পিতা-মাতার হক। কুরআনুল কারিমে বহু আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা পিতা-মাতার খেদমত করার সর্বাধিক তাগিদ দিয়ে তার ইবাদতের পরেই মানুষকে পিতা-মাতার খেদমত করার নির্দেশ দিয়েছেন। মহান আল্লাহর ইবাদত করা যেমনি ফরজ, পিতা-মাতার খেদমত করাও তেমনি ফরজ।
ইরশাদ হচ্ছে-‘আপনার পালনকর্তা আদেশ করেছেন যে, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাঁদের কেউ অথবা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তা হলে তাঁদের সঙ্গে ‘উহ্’ শব্দটিও বলো না। তাদেরকে ধমকও দিয়ো না। তাদের সঙ্গে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বলো। তাদের সামনে ভালোবাসার সঙ্গে বিনম্র ভাবে মাথানত করে দাও এবং বলো হে পালনকর্তা তাঁদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেমনটি তাঁরা আমাদের শৈশব কালে করেছেন’ (সুরা বনি ইসরাঈল, ২৩-২৪)। পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার অর্থ হলো পিতা-মাতার হক বা তাদের অধিকার আদায় করা।
এই আয়াতে আল্লাহ পাক দুটো নির্দেশ পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। একটা হলো, আল্লাহর ইবাদত কর। এটা হলো আল্লাহর হক। তারপর বলা হয়েছে পিতা-মাতার হক আদায় কর। এ দুটো কথাকে পাশাপাশি বলার উদ্দেশ্য হলো একথা বোঝানো যে, আল্লাহর হক আদায় করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, পিতা-মাতার হক আদায় করাও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর হক আদায় না করলে যেমন নাজাত পাওয়া যাবে না, পিতা-মাতার হক আদায় না করলেও নাজাত পাওয়া যাবে না। আল্লাহর হক আদায় না করলে যেমন আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন, পিতা-মাতার হক আদায় না করলেও আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট হবেন। হযরত আব্দুল্লাহ হবনে আমর (রাঃ) বলেন যে, “রসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেছেন, পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহ অসন্তুষ্টি নিহিত (তিরমিযী)।” হযরত আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন যে, “রসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তার নাক ধুলি ধুসরিত হোক! তার নাক ধুলি ধুসরিত হোক! তার নাক ধুলি ধুসরিত হোক! জিজ্ঞাসা করা হল ইয়া রসুলাল্লাহ! কে সে? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি নিজের মাতা-পিতার কোনো একজনকে অথবা উভয়কে তাঁদের বার্ধক্য অবস্থায় পেল অথচ সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না (মুসলিম)।”
হাদিসে উল্লিখিত ‘নাক ধুলি ধুসরিত হোক’ কথাটি আরবের একটি প্রবচন। এটি অসন্তুষ্টি ও ধ্বংসের তথা অভিশাপের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর ‘জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না’ বলতে জান্নাতে প্রবেশের অধিকার লাভ করার সুযোগ পেয়েও সে সেই অধিকার লাভ করতে পারল না বোঝানো হয়েছে। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত; রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে সন্তান পিতা-মাতার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবে তার প্রত্যেক দৃষ্টির বিনিময়ে একটি কবুল হজ্জের সওয়াব হবে।” লোকেরা প্রশ্ন করলো ইয়া রসুলুল্লাহ! যদি দিনে একশত বার দৃষ্টিপাত করে? জবাবে তিনি বললেন, “দৈনিক একশত বার দৃষ্টি দিলেও প্রত্যেক দৃষ্টিতে একটি কবুল হজ্জের সওয়াব পাবে।” সন্তানের উপর পিতা-মাতার ১৪টি অধিকার রয়েছে। তার মধ্যে ৭টি জীবিতকালে, যথা- তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা, ভালবাসা প্রকাশ করা, তাদের সেবা করা, আনুগত্য করা, সুখ-শান্তির চিন্তা করা, প্রয়োজন পূরণ করা ও তাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে সাক্ষাৎ করা। আর ৭টি মৃত্যুর পর, যথা- তাদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা, তাদের ঋণ পরিশোধ করা, তাদের রেখে যাওয়া আমানত পরিশোধ করা, তাদের বৈধ অসিয়ত পূরণ করা, তাদের বন্ধু ও স্বজনদের সম্মান করা, তাদের বন্ধু ও স্বজনদের সহযোগিতা করা ও মাঝে মাঝে তাদের কবর জিয়ারত করা।
লেখক : প্রধান শিক্ষক পশ্চিম বানিয়াখামার দারুল কুরআন বহুমুখী মাদ্রাসা, খতিব- বায়তুল আমান জামে মসজিদ, হরিণটানা, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম

