এক দশকেরও বেশি সময় আগে নরেন্দ্র মোদি যখন দেশ পরিচালনার জন্য প্রথম প্রচারণা শুরু করেন, তখন তিনি কংগ্রেসমুক্ত ভারত গড়ার ডাক দেন। স্বাধীন ভারতের প্রতিষ্ঠাতা দল কংগ্রেস এরপর থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দলটি খুব একটা ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। সেই নির্বাচনে পার্লামেন্টে তাদের আসনসংখ্যা ২০৬ থেকে কমে এক ধাক্কায় মাত্র ৪৪-এ নেমে আসে। দলটি রাজ্য বিধানসভাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এখন মোদির শাসক জোটের দখলে রয়েছে ২১টি রাজ্য। সেখানে কংগ্রেস মাত্র চারটি রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে।
কংগ্রেসের পতনের ফলে ভারতজুড়ে আঞ্চলিক দলগুলোই মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি এবং তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়। এসব আঞ্চলিক দলের নেতারা মোদির বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও শক্তিশালী ছিলেন দুজন— একজন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনি ২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। আরেকজন এম কে স্ট্যালিন, যিনি ২০২১ সাল থেকে ছিলেন তামিলনাড়ুর দায়িত্বে।
এ সপ্তাহে মমতা ব্যানার্জী ও স্ট্যালিন উভয়েই নির্বাচনে পরাজিত হন। ফলে মোদি নিজেকে এমন এক ভারতের নেতৃত্বের আসনে দেখতে পাচ্ছেন, যেখানে তার বিরোধীদের কার্যত কোনো রাজনৈতিক ক্ষমতা নেই। বিভিন্ন সময়ে পার্লামেন্টে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা বেশি ছিল। কিন্তু এখন মোদি ভারতকে একটি একক নেতার নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রের মতো করে তুলে ধরছেন।
স্বাধীনতার পর ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু যে ‘ভারত রাষ্ট্রে ধারণা’ তুলে ধরেছিলেন, তা ছিল এই বিশাল দেশের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানবিক বৈচিত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি রাজনৈতিক বহুত্ববাদের আদর্শ। এখন বিজেপির একটি রক্ষণশীল হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের শতবর্ষী স্বপ্নের কাছে নেহরুর সেই স্বপ্ন এক অদ্ভুত পরাজিত সত্তা বলেই মনে হচ্ছে।
বিজেপি সব সময় তার সদস্যদের আদর্শগত অঙ্গীকার নিয়ে গর্ববোধ করে। সারা দেশের হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করাই দলটির কৌশল। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দলটি অন্য যেকোনো জাতীয় দলের চেয়ে সাংগঠনিকভাবে বেশি সুশৃঙ্খল। সেই সঙ্গে একটি ব্যবসাবান্ধব খ্যাতিও লাভ করেছে দলটি।
সমর্থকদের মতে, গত জাতীয় নির্বাচনে ধাক্কা খাওয়ার পর কঠোর পরিশ্রম করে বিজেপি। সেই পরিশ্রমের ফলেই সাম্প্রতিক রাজ্যস্তরের ধারাবাহিক বিজয়গুলো এসেছে। ২০২৪ সালের জুনে যখন ভোট গণনা করা হয়, তখন তাদের জোট মাত্র ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কারণ সে সময় বিরোধী দলগুলো দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব এবং বৈষম্য নিয়ে মোদির তীব্র সমালোচনা করে। তবে দুটি আঞ্চলিক দলকে জোট সরকারে অন্তর্ভুক্ত করে বিজেপি ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম হয়।
রাজনৈতিক ভাষ্যকার সুগত শ্রীনিবাসরাজু বলেন, ‘২০২৪ সালে মোদি ছিলেন এক আহত বাঘের মতো। এখন তিনি ঠান্ডা মাথায় প্রতিশোধ নিতে নেমেছেন।’
এর পরপরই দলটির কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নতুন ভোটারদের দলে ভেড়াতে চেষ্টা করতে শুরু করে। শুরু হয় বিজেপির নতুন জয়ের ধারা। সমালোচকেরা বলেন, মোদি কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা ব্যবহার করে ভোট কিনেছেন, ভোটার বাদ দিয়েছেন এবং জালিয়াতি করে জয়লাভ করেছেন।
এরপর থেকে তার প্রশাসন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম দুই মেয়াদে নেওয়া জাঁকজমকপূর্ণ ও বিতর্কিত প্রকল্পগুলো এড়িয়ে গেছে। এর পরিবর্তে রাজ্য নির্বাচনে জেতার দিকে মনোযোগ দিয়েছে দলটি। জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপসহ সাধারণ মানুষের মৌলিক বিষয়গুলোর দিকে নজর দেয়।
রাজ্যগুলোতে মোদির এই অগ্রযাত্রা একের পর এক চমক নিয়ে আসে, যার প্রতিটিই বিজেপির পক্ষে যায়। দলটি ২০২৪ সালের অক্টোবরে হরিয়ানায় জয়লাভ করে, যদিও কংগ্রেসের জেতার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। এরপর দলটি মহারাষ্ট্রে বিজয় ছিনিয়ে নেয়।
পরাজিত দলগুলো কারচুপির অভিযোগ তোলে এবং নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে। কংগ্রেস বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরলেও বিজেপি তা প্রত্যাখ্যান করে।
২০২৫ সালে বিজেপি ২৭ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো রাজধানী দিল্লিতে জয় লাভ করে। পরাজিত হন অরবিন্দ কেজরিওয়াল, যিনি ২০১৪ সাল থেকে মোদির উত্থানকে চ্যালেঞ্জ জানানো অল্প কয়েকজন রাজনীতিবিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন।
ভারতের আসামে বিতর্কিত ভোটার তালিকা সংশোধন
গত বছর বিহারে ভোটার তালিকা থেকে অপ্রাসঙ্গিক নাম বাদ দেওয়ার জন্য একটি ব্যাপক নিরীক্ষা কার্যক্রম শুরু করে দেশটির নির্বাচন কমিশন। এই প্রক্রিয়ার কারণে বহু মানুষ ভোট দিতে পারেননি। রাজ্যের মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা বলেন, তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের অন্যায়ভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয় লাভ করে বিজেপি।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের ফলে ৯০ লাখ নাম বাদ পড়ে যায় এবং অন্তত ২৭ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারেননি। আর এটা বিজেপিকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দুদের দাঁড় করাতে আবারো সাহায্য করেছে। মমতার বিরুদ্ধে দলটির জয়ের ব্যাপ্তি এতটাই ব্যাপক ছিল যে, কেবল হতাশ ভোটারদের দিয়েই এই বিজয়কে ব্যাখ্যা করা যায় না। পশ্চিমবঙ্গের অনেক মানুষ কেবল মমতা ব্যানার্জীর দলকে ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করতে চেয়েছিলেন।
কলকাতার জুস বিক্রেতারা শিবু সিংহ বলেন, আগের নির্বাচনগুলোতে তিনি মমতাকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি হিন্দুদের পরিবর্তে মুসলিমদের রক্ষা করছেন। বাংলায় কোনো শিল্প আসছে না, তুরণা চাকরি পাচ্ছে না।’
দক্ষিণে তামিলনাড়ুতে অর্থনীতি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু দ্রাবিড় মুনেত্র কাজাগাম (ডিএমকে) দলের প্রধান স্ট্যালিন বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে দক্ষিণী মেগাস্টার বিজয় থালাপতির দল। পশ্চিমবঙ্গের ভোটের মতোই, এখানেও পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দেন ভোটাররা।
মোদি ১২ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন। নয়াদিল্লির রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরথ বলেন, ‘বিজেপির নির্বাচনী যন্ত্রকে আমি কৃতিত্ব দেবই। তারা মাঠে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কাজ করেছে, নির্বাচনী এলাকা ও জনসংখ্যার বিন্যাস চিহ্নিত করেছে, এবং মমতার সমর্থনের কোন ফাটলগুলোকে তারা আরো চওড়া করতে পারে তা দেখার চেষ্টা করেছে।’
রাহুল গান্ধী এখন কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্বাধীন একটি দুর্বল বিরোধী জোটের প্রধান, ২০১৪ সালে যেমনটা চেয়েছিলেন মোদি, ঠিক তেমনই। ২০২৯ সালে ভারতে পরবর্তী নতুন সংসদ নির্বাচনের সময়, মোদির বয়স হবে ৭৮ বছর। তিনি আবার তার দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন কি না, বা তার জায়গায় কে আসবেন, তা কেউ জানে না। তার উত্তরসূরি বিজেপির ভেতর থেকেই আসতে পারেন।
তবে রাজনৈতিক ভাষ্যকার শ্রীনিবাসরাজু বলেন, ‘কেউই একদলীয় শাসন চায় না।’ তিনি বলেন, ‘ভারতের একটি বিকল্প প্রয়োজন। গণতন্ত্র মানে শাসক দল নয় বরং একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা।’
খুলনা গেজেট/এএজে

