কথার নয়, কাজের বাংলাদেশ চাই

কামরুল ইসলাম

আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন সবাই পরিবর্তন চায় কিন্তু পরিবর্তনের দায়িত্ব নিতে চায় খুব কম মানুষ। সবাই ভালো রাজনীতি চায়, কিন্তু রাজনীতিতে নৈতিকতার চর্চা কতটা চাই, সে প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। সবাই সুশাসন চায়, কিন্তু নিজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আমরা কতটা সচেতন? সবাই দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চায়, অথচ সুযোগ পেলে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার প্রবণতা থেকে আমরা কতটা মুক্ত?

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের সংকট এবং আদর্শ শিক্ষার অভাব এসবকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এগুলো পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটি সমস্যার সঙ্গে অন্যটির গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

রাজনীতি যখন আদর্শ হারায়, সমাজে তার প্রভাব পড়ে। সমাজ যখন মূল্যবোধ হারায়, তার প্রভাব পড়ে পরিবার ও শিক্ষাব্যবস্থায়। শিক্ষা যখন মানুষ তৈরির পরিবর্তে শুধু পরীক্ষার ফল ও সার্টিফিকেটের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন সেই শিক্ষার মধ্য দিয়ে তৈরি হয় জ্ঞানী মানুষ কিন্তু সবসময় বিবেকবান মানুষ নয়। আর বিবেকহীন জ্ঞান কখনো একটি জাতির জন্য আশীর্বাদ হতে পারে না।

রাজনীতির মূল সংকট : আদর্শের পরিবর্তে স্বার্থ

রাজনীতি একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। সৎ ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতি একটি দেশকে এগিয়ে নিতে পারে; বিপরীতে স্বার্থনির্ভর রাজনীতি একটি জাতির সম্ভাবনাকে নষ্ট করতে পারে।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো আমরা অনেক সময় নীতির চেয়ে ব্যক্তিকে, আদর্শের চেয়ে দলকে এবং সত্যের চেয়ে পক্ষপাতকে বেশি গুরুত্ব দিই। নিজের পক্ষের অন্যায়কে অন্যায় বলতে না পারা এবং প্রতিপক্ষের ভালো কাজকেও স্বীকার না করার মানসিকতা কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির লক্ষণ নয়।

জবাবদিহি ছাড়া কোনো রাষ্ট্র সুস্থ থাকতে পারে না :

একটি রাষ্ট্রে আইন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে, প্রশাসন আছে কিন্তু যদি জবাবদিহি না থাকে, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে। অন্যায় করে যদি পার পাওয়া যায়, তাহলে অন্যায় বাড়ে। দায়িত্বে অবহেলা করেও যদি কোনো জবাবদিহি না থাকে, তাহলে দায়িত্বহীনতা বাড়ে। ক্ষমতার অপব্যবহারের পরও যদি কোনো প্রশ্ন না ওঠে, তাহলে ক্ষমতার অপব্যবহার স্বাভাবিক হয়ে যায়। তাই রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো সবার জন্য সমান জবাবদিহি।

অপরাধী কোন দলের, কোন মতের, কোন পরিচয়ের এটি নয়; সে অপরাধ করেছে কী না, সেটিই হতে হবে মূল প্রশ্ন। আইনের শাসনের প্রকৃত অর্থই হলো আইনের চোখে সবাই সমান।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন : আমরা কেমন মানুষ তৈরি করছি!

একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় প্রথম হলো এটি আনন্দের বিষয়। কিন্তু সে কি সত্যবাদী? সে কি দায়িত্বশীল? সে কি দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ায়? সে কি অন্যের অধিকারকে সম্মান করে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও আমাদের জানতে হবে। কারণ শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু ভালো চাকরি পাওয়া নয়; শিক্ষা মানুষকে ভালো মানুষ বানানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। একজন মানুষ যদি অনেক ডিগ্রির মালিক হয়েও দুর্নীতি করেন, মিথ্যা বলেন, অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন, দায়িত্বে অবহেলা করেন তাহলে তার শিক্ষা কতটা সফল।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু মেধাবী নয়, নৈতিক মানুষ তৈরি করা। শুধু দক্ষ নয়, দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। শুধু সফল নয়, মানবিক মানুষ তৈরি করা।

প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের মধ্যে সত্যবাদিতা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ আজকের শিশুই আগামী দিনের নাগরিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক, পুলিশ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, উদ্যোক্তা ও রাজনৈতিক নেতা। আজ আমরা যে শিক্ষা দেব, আগামী দিনের বাংলাদেশ তারই প্রতিফলন দেখবে।

বিদ্যালয় শুধু পরীক্ষার কারখানা হতে পারে না :

আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল ও সার্টিফিকেটের কেন্দ্র বানালে চলবে না। একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল তার পাশাপাশি সে কতটা ভালো মানুষ হলো, সেটিও মূল্যায়নের বিষয় হওয়া উচিত। বিদ্যালয় হবে এমন একটি জায়গা, যেখানে শিশু শিখবে সত্য বলতে। অন্যায়কে না বলতে। ভিন্নমতকে সম্মান করতে। দুর্বলকে সাহায্য করতে। নিজের ভুল স্বীকার করতে। নিজের দায়িত্ব পালন করতে। দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে। এই শিক্ষার সবচেয়ে বড় বাহক হলেন শিক্ষক।

সমাধানের পথ কী?

সমস্যা যত গভীরই হোক, সমাধানের পথও আছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ।

এক. রাজনীতিতে নৈতিকতা ফিরিয়ে আনতে হবে। রাজনীতি হতে হবে জনসেবার মাধ্যম। যোগ্যতা, সততা ও দেশপ্রেমকে নেতৃত্বের প্রধান মানদণ্ড করতে হবে।

দুই. আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের মূল বিষয়। আইন প্রয়োগে বৈষম্যের সুযোগ থাকা উচিত নয়।

তিন. শিক্ষার লক্ষ্য পুনর্র্নিধারণ করতে হবে। পরীক্ষার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু চরিত্র গঠন তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা হতে হবে জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার সমন্বয়।

চার. পরিবারকে নৈতিক শিক্ষার প্রথম প্রতিষ্ঠান করতে হবে। শিশুর প্রথম শিক্ষক তার মা-বাবা। তাই সন্তানকে ভালো মানুষ করতে হলে প্রথমে বড়দের নিজেদের আচরণে সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

পাঁচ. কথার চেয়ে কাজকে মূল্য দিতে হবে। দেশের জন্য বড় বড় বক্তৃতার চেয়ে ছোট একটি ভালো কাজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, একটি শিশুকে শিক্ষার সুযোগ দেওয়া, একজন তরুণকে কর্মসংস্থানের পথ দেখানো কিংবা একটি অন্যায় প্রতিরোধ করা এসবই দেশসেবা।

ছয়. তরুণদের ইতিবাচক কাজে যুক্ত করতে হবে। তরুণদের বিভাজন ও সংঘাতের রাজনীতির বাইরে এনে শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সামাজিক সেবায় যুক্ত করতে হবে।

সাত. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীলতা বাড়াতে হবে। গুজব নয়, সত্য। উসকানি নয়, যুক্তি। অপমান নয়, সমালোচনা। বিভাজন নয়, সম্প্রীতি। ই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

পরিবর্তন শুরু হবে কোথা থেকে। আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি দেশকে বদলাবে, সরকার রাজনীতিবিদ প্রশাসন না শিক্ষক ? উত্তর হলো আমরা সবাই। একজন শিক্ষক তার শ্রেণিকক্ষ থেকে দেশ বদলাতে পারেন। একজন মা তার সন্তানকে সত্যবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলে দেশ বদলাতে পারেন। একজন বাবা তার সন্তানকে দায়িত্বশীল নাগরিক হওয়ার শিক্ষা দিয়ে দেশ বদলাতে পারেন। একজন সাংবাদিক সত্য ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশ করে দেশ বদলাতে পারেন। একজন রাজনৈতিক নেতা ক্ষমতার পরিবর্তে জনসেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশ বদলাতে পারেন। আর একজন সাধারণ নাগরিকও নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে দেশ বদলাতে পারেন।

শেষ কথা : বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন শুধু নতুন আইন নয়; প্রয়োজন নতুন মানসিকতা। প্রয়োজন এমন রাজনীতি, যেখানে ক্ষমতার চেয়ে জনগণ বড়। প্রয়োজন এমন শিক্ষা, যেখানে সার্টিফিকেটের চেয়ে চরিত্র বড়। প্রয়োজন এমন সমাজ, যেখানে ভিন্নমত শত্রুতা নয়। প্রয়োজন এমন নাগরিক, যারা অধিকার দাবি করার পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করতেও জানেন। প্রয়োজন এমন একটি জাতীয় সংস্কৃতি, যেখানে কথার চেয়ে কাজের মূল্য বেশি।

আমরা যদি শুধু অন্যের ভুল খুঁজে যাই, কিন্তু নিজের ভুল সংশোধন না করি তাহলে কোনো পরিবর্তন আসবে না। পরিবর্তন শুরু করতে হবে নিজের ভেতর থেকে। নিজের পরিবার থেকে। নিজের কর্মক্ষেত্র থেকে।

কথায় নয় কাজে। বিভাজনে নয় সম্প্রীতিতে। প্রতিহিংসায় নয় ন্যায়ে। অবক্ষয়ে নয় নৈতিকতায়। শুধু জ্ঞান নয় আদর্শ শিক্ষায়। এভাবেই গড়ে উঠুক আমাদের কাক্সিক্ষত বাংলাদেশ। এখন সময় কথার বাংলাদেশকে কাজের বাংলাদেশে রূপান্তর করার।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, সোনামুখ স্মার্ট একাডেমি ও অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন