শুক্রবার । ১০ই এপ্রিল, ২০২৬ । ২৭শে চৈত্র, ১৪৩২

শিক্ষকদের সদিচ্ছা ও আন্তরিক পরিবর্তন ছাড়া শিক্ষার উন্নতি সম্ভব নয়

কামরুল ইসলাম

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সংস্কার, নীতি প্রণয়ন এবং সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও প্রত্যাশিত ফলাফল এখনও দৃশ্যমান নয়। একের পর এক শিক্ষানীতি, পাঠ্যক্রম পরিবর্তন, ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা চালু, অবকাঠামো উন্নয়ন সবকিছু মিলিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্যোগের ঘাটতি নেই। তবুও প্রশ্ন থেকে যায় : কেন শিক্ষা ব্যবস্থার কাক্সিক্ষত উন্নয়ন হচ্ছে না? এর একটি মৌলিক উত্তর হলো : শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার ঘাটতি।

প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো শিক্ষক। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানই করেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ গঠনের পথপ্রদর্শক। কিন্তু যখন শিক্ষক নিজ দায়িত্ব পালনে আন্তরিক না হন, তখন কোনো নীতিমালা বা প্রযুক্তি শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নেন না, ক্লাসে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া উপস্থিত হন, কিংবা শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধের ঘাটতি দেখান। ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ কমে যায় এবং শিক্ষা একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। এমনকি শ্রেণি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনেক শিক্ষক নিরুৎসাহিত করেন এবং তাদেরকে কোচিং সেন্টারে যেতে বাধ্য করে থাকেন।

দ্বিতীয়ত, সরকারি পদক্ষেপগুলোর ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো বাস্তবায়নের দুর্বলতা। নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই আধুনিক ও যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর হয় না। এর পেছনে প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি এবং পর্যবেক্ষণের অভাব যেমন দায়ী, তেমনি শিক্ষকদের অনীহাও বড় একটি বড় কারণ। যদি শিক্ষকরা পরিবর্তন গ্রহণে আগ্রহী না হন, তবে কোনো নতুন পাঠ্যক্রম বা পদ্ধতি সফল হওয়া কঠিন। সরকার গৃহীত যেকোন পদক্ষেপ তারা মেনে না নিয়ে বরং বিরূপ সমালোচনা করেন এবং শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝান।

তৃতীয়ত, কোচিং নির্ভরতা ও বাণিজ্যিক মনোভাব শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেক শিক্ষকই মূল ক্লাসে যথাযথ শিক্ষা প্রদান না করে কোচিং বা প্রাইভেট পড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দেন। এতে শিক্ষা একটি সেবামূলক কাজ থেকে বাণিজ্যে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচ করে শিক্ষা গ্রহণ করে, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষার সমতা নষ্ট করে। অনেক শিক্ষক তার কোচিংয়ে না গেলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করেন। যার ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে কোচিংমুখী হয়।

চতুর্থত, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার দুর্বলতাও একটি বড় সমস্যা। অনেক শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে একই পদ্ধতিতে পড়াচ্ছেন। নতুন শিক্ষাদান কৌশল বা প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছেন না। সরকার বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করলেও সেগুলোর কার্যকারিতা অনেক সময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কারণ, প্রশিক্ষণ শেষে তা বাস্তবে প্রয়োগ করার মানসিকতা অনেকের মধ্যে থাকে না। কিছু কিছু শিক্ষক আছেন যারা হাজার প্রশিক্ষণ দিলেও পরিবর্তন হবেন না। কারণ তাদের ধারণ ক্ষমতা নেই বললেই চলে। তাদের অধিকাংশের নিয়োগ ছিল ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে অথবা আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের শিক্ষার করুণ পরিণতির জন্য শিক্ষকদের আরও অনেক দোষ বের করা কোনো গবেষণার বিষয় নয়। চোখ মেললেই দেখা মিলবে হাজারো ত্রুটি। দেশের সকল সরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গোপনে পরিদর্শন করলে আরো ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠবে।

তবে শুধু শিক্ষকদের দোষারোপ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাদের প্রাপ্য সম্মান, ন্যায্য বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি। একজন শিক্ষক যখন নিজেকে মূল্যবান ও সম্মানিত মনে করেন, তখনই তিনি তার দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে উদ্বুদ্ধ হন। এই সম্মান আদায় করার দায়িত্বও শিক্ষকদের উপর বর্তায়। এখনও এ দেশে এমন অনেক শিক্ষক আছেন যাঁরা তাঁদের উপযুক্ত আসন ও মর্যাদা পেয়ে থাকেন। তাই সকল শিক্ষককে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের হাজারো চাওয়া পাওয়া থাকতে পারে; থাকবে নানাবিধ সমস্যা। আমাদের এই গরীব দেশে সকলের সমস্যা আছে। সরকারের দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা থাকবে। কিন্তু আপনি হলেন শিক্ষক। ধরে নিন, সকল শিক্ষার্থী আপনার নিজের সন্তান। অতএব সকল দায় আপনাকেই নিতে হবে। নইলে আগামী প্রজন্মের কাছে এবং আপনার বিবেকের কাছে আপনিই দায়বদ্ধ থাকবেন।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য নীতিমালা, অবকাঠামো বা প্রযুক্তির পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শিক্ষকদের সদিচ্ছা, দায়বদ্ধতা ও পেশাগত সততা। শিক্ষক যদি তার ভূমিকার গুরুত্ব উপলব্ধি করে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তবে শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। অন্যথায়, হাজারো সংস্কার ও পরিকল্পনাও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন