ডুমুরিয়া থানার শরাফপুর একটা গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন, অনেক লোকের বাস। এখানে অত্র ইউনিয়ন পরিষদ ভবন দোতলা এবং সুরক্ষিত। অতএব রাজাকারদের পছন্দ মতো স্থানে রাজাকার ক্যাম্প। সাহস ইউনিয়ন পাশাপাশি রাজাকার কমান্ডার হাসেম আলী গজেন্দ্রপুর গ্রামের মুক্তিবাহিনীর ভয়ে ভীত, আর সোহরাবপুরের কমান্ডার তমিজউদ্দীন শেখ তারাও ভীত- মুক্তিযোদ্ধারা কখন কীভাবে তাদের উপর আক্রমণ করে। তাই প্রশাসন ও দুই কমান্ডার শলা পরামর্শ করে দুই ইউনিয়নের রাজাকার এই সঙ্গে সোহরাবপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে থাকবে এ সিদ্ধান্ত হয়। থানা থেকে রাজাকার ক্যাম্পের দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার কিন্তু তৎকালীন খালবিল নদী-নালার কারণে থানা সদরের সাথে একরকম বিচ্ছিন্ন ছিল এ ইউনিয়ন। দুইগ্রুপ মিলে মোট ৪০/৫০ জন রাজাকার এ ক্যাম্পে অবস্থান করতো। হাতিয়ার ছিল মার্ক-ফোর রাইফেল। এই ক্যাম্পের উত্তরে ভদ্রা নদী, দক্ষিণে ভুলবাড়িয়া গ্রাম, পূর্বে সোহরাবপুরের বড় বিল এবং পশ্চিম কালিকাপুর গ্রাম।
পক্ষান্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প ছিল বারুইকাটি গ্রামের বিশিষ্ট ধনী জমিদার শ্রেণির ব্যক্তিত্ব বিষ্ণু রায়ের বাড়ি, এটা ছিল ডুমুরিয়া থানার অন্তর্গত শোভনা ইউনিয়ন। এ অঞ্চল থানা সদর থেকে আরও বিচ্ছিন্ন থাকায় বারুইকাটি এতদঞ্চলের মুক্তি বাহিনীর সদর দপ্তর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এখানে মুজাহিদ কমান্ডার নূরুল ইসলাম মানিকের নেতৃত্বে মুক্তি বাহিনীর বিশাল শক্তিশালী বাহিনী গড়ে ওঠে যারা ডুমুরিয়া অঞ্চল ছাড়াও বাহিরে গিয়ে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতো। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ছিল এল.এম.জি, এস.এল.আর, এস.এম.জি, ৩০৩ রাইফেল আর গ্রেনেড।
রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধার সহ অবস্থান চলে না। তাছাড়া রাজাকারদের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ, তাই বানিয়াখালি রাজাকার ক্যাম্প অপারেশন করে ক্যাম্প দখল ও তাদের অস্ত্রশস্ত্র দখল করা এবং সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাই মূল লক্ষ্য। কমান্ডারের নির্দেশ ৩/৪ দিন যাবৎ রেকী করার পর শত্রুর সর্বশেষ অবস্থান নেয়া হলো। সময়টা ছিল আশ্বিন-কার্তিক মাস, ঐ দিন সংক্রান্তি ছিল। ভদ্রা নদীর তীরে ঐ স্থানে একটা বটগাছ ছিল, সিদ্ধান্ত হলো সকলেই বিচ্ছিন্ন পথ দিয়ে এখানে উপস্থিত হবে এবং এখান থেকে যার যারু দায়িত্ব ও কমান্ড থাকবে নূরুল ইসলাম মানিকের আর দক্ষিণ দিক দিয়ে গ্রুপ কামান্ডার চন্দ্রকান্তি তরফদারের নেতৃত্বে একদল এবং নদীর পাড়ে বটগাছের কাছে উত্তর-পূর্ব কর্নার থেকে গ্রুপ কমান্ডার মোঃ মাহবুবুর রহমান দুর্র্ধষ আক্রমণ চালাবে। কমান্ডার মানিকের নির্দেশনা মোতাবেক গ্রুপ কমান্ডারগণ স্ব-স্ব অবস্থানে পৌঁছানোর পর তিন দিক থেকে আক্রমণ শুরু হলো, রাজাকাররা চিৎকার, দৌড় ঝাপের পর গোলাগুলি শুরু করলো। অধিকাংশ রাজাকাররা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে ঘরেই পায়খান প্র¯্রাব করে ঘর নোংরা করলো, কিন্তু কয়েকজন দোতলা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকলো। শত্রুপক্ষ সুরক্ষিত দালানে কিন্তু মুক্তিবাহিনী খোলা জায়গায় তাই মুক্তিযোদ্ধারা সাহসের সাথে যুদ্ধ করতে থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের গেটে যেতে পারিনি, গেট আরও সুরক্ষিত।
উভয় পক্ষের গোলাগুলিতে গোটা গ্রাম জেগে উঠলো, চারদিকে আতঙ্ক। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ ক্যাম্প দখল না করে তারা পিছু হটবে না। আত্মসমর্পণের নামে ছলনা করে এসব রাজাকাররা সময় নিচ্ছে। তুমুল যুদ্ধ চলছে, ইতোমধ্যে ভোর হয়ে গেল-এমেন সময় ভদ্রা নদীতে গানবোটের আগমন সংবাদ এলো, পাকসেনা রাজাকাররা মিলে সকলকে ঘিরে ফেলতে পারে তাই কমান্ডার ও গ্রুপ কমান্ডারগণ প্রত্যাহারপূর্বক পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নিলেন, গুলি করতে করতে এবং একদল আর এক দলকে কভারিং দিয়ে প্রত্যাহার করা হলো। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের কেহই হতাহত হয়নি কিন্তু রাজাকারদের অনেকেই আহত হয়। রাজাকাররা গানবোট করে চলে যায়। তারা এখানে আর কখনো ফিরে আসেনি। ফলে এ অভিযানের ফলাফল মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে আসে।
এ যুদ্ধে যারা অংশ নিয়েছিল তারা হলো- বিজন বিহারী মিস্ত্রি, সন্তোষ রায়, রবীন্দ্রনাথ বৈরাগী, নৃপেন বিশ্বাস, অরবিন্দু মন্ডল, গোপাল গোলদার, অমলকৃষ্ণ বৈরাগী, আলতাফ হোসেন সরদার, আনছার আলী সরদার, সিরাজুল ইসলাম সরদার, শেখ ফিরোজ রহমান, সুধাংশু কুমার ফৌজদার, সন্তোষ কুমার বিশ্বাস, হারাচান মন্ডল, নির্মল চন্দ্র রায়।
তাছাড়া তেরখাদা ও বটিয়াঘাটা থানার বেশকিছু মুক্তিযোদ্ধা এ যুদ্ধে অংশ নেয়, তারা হলো- পঙ্কজ বিশ্বাস, মনোরঞ্জন মল্লিক, নব কুমার সরদার, সুশীল কুমার বৈরাগী, শেখ মোশারফ হোসেন, কুদ্দুস, আদম আলী প্রমুখ।
কমান্ডার মানিকের পরিচালনায় গ্রামবাসী ও মুক্তিযোদ্ধারা পুরো যুদ্ধকালীন সময় একযোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিজ্ঞা করে, ফলে এ অঞ্চল মুক্তিযোদ্ধাদের শক্ত ঘাঁটি-অঞ্চল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন জানান, ১৩ ডিসেম্বর ডুমুরিয়া শত্রু মুক্ত হয়। সর্বত্র স্বাধীনতার পতাকা উড়তে থাকে। বিভিন্নস্থানে বিজয় মিছিল হয়।
(সূত্র: স ম বাবর আলী রচিত স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান)

