শুক্রবার । ২৭শে মার্চ, ২০২৬ । ১৩ই চৈত্র, ১৪৩২

রাজনীতির আঁতুড়ঘর থেকে রণাঙ্গন

প্রিয়া রহমান

এম এম সিটি কলেজ রাজনীতির আঁতুড়ঘর হিসেবে সুপরিচিত। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বাঙালির জাতীয় চেতনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাঙালি নিজেকে একটি লড়াকু জাতি হিসেবে প্রস্তুত করে তোলে। পাকিস্তান আমলের শেষ সময়ে খুলনার সামগ্রিক রাজনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ দৃঢ়ভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে। এই প্রেক্ষাপটে এমএমসি টিক কলেজ (সিটি কলেজ) হয়ে ওঠে ছাত্ররাজনীতি ও স্বাধীনতার আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ষাটের দশকের শেষদিকে কলেজটির ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্রভাব সুস্পষ্ট ছিল। ১৯৬৮-৬৯ সালে শেখ শহীদুল হক ভিপি এবং শেখ আজমল হোসেন জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে এ কলেজের শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া ও নির্যাতন চললেও তাদের আন্দোলন থেমে থাকেনি।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয় এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয় বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করে। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণায় সারা বাংলার মতো খুলনাতেও ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। এমএম সিটি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে। ‘জয় বাংলা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর’ এসব স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে খুলনার রাজপথ।

মার্চের শুরু থেকেই স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠনে দেয়াল লিখন, মিছিল ও সংগঠনের কাজ জোরদার হয়। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান লিখে জনসচেতনতা সৃষ্টি করেন। ৩ মার্চ মিউনিসিপ্যাল পার্ক (বর্তমান শহিদ হাদিস পার্ক) থেকে বের হওয়া মিছিলে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিবর্ষণ আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে।

৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের খুলনা কমিটি গঠিত হয়। পাশাপাশি গড়ে ওঠে ‘জয় বাংলা বাহিনী’, যারা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ শুরু করে। ২৩ মার্চ প্রথমবারের মতো খুলনায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয় যা ছিল প্রতীকী স্বাধীনতার ঘোষণা।

২৫ মার্চের গণহত্যার পর খুলনায় মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন আরও সুসংগঠিত হয়। ২৬ মার্চ গঠিত হয় বিপ্লবী পরিষদ এবং রূপসার পূর্ব পাড়ে স্থাপিত হয় জেলার প্রথম মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প। এখান থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিতে শুরু করেন।

৪ এপ্রিল গল্লামারী রেডিও স্টেশন দখলের প্রচেষ্টা ছিল খুলনার মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই অভিযানে শহীদ হন হাবিবুর রহমান খান ও মোসলেম আলী হাওলাদার। একই যুদ্ধে শহীদ হন অভিযানের অধিনায়ক সুবেদার মেজর শেখ জয়নুল আবেদীন। তাদের আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।

পরবর্তীতে এমএম সিটি কলেজের অসংখ্য শিক্ষার্থী ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মোল্লা মোশাররফ হোসেন, শেখ শহীদুল হক, শরীফ খসরুজ্জামান, এস. এম. জিয়াউল ইসলাম, শেখ আবুল কাশেম, নুরুল ইসলাম খোকনসহ অনেকে। তারা কেউ সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে, কেউ সংগঠন ও প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণে অংশগ্রহণকারী অনেকেই জানিয়েছেন, তারা বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সুন্দরবন, বাগেরহাট, পাইকগাছা, ফকিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় তারা সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন এবং বিজয়ের পতাকা ছিনিয়ে আনেন।

এম এম সিটি কলেজ শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয় এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়ের নাম। এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের আত্মত্যাগ, সাহসিকতা ও দেশপ্রেম বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে শক্তিশালী করেছে। তাদের অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।

তথ্যসূত্র : কাজী মোতাহার রহমান, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা এম এম সিটি কলেজ।

স. ম. বাবর আলী, স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান মোঃ আবু জাফর, মুজিব বাহিনী : খুলনা জেলা ৭১।

 

খুলনা গেজেট/এনএম/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন