মানুষ এবং আমাদের এই গ্রহের সার্বিক কল্যাণের জন্য বন অত্যাবশ্যক। তারা বিশুদ্ধ বাতাস, পানি, খাদ্য এবং ওষুধ সরবরাহ করে এবং বিভিন্ন বন্যপ্রাণী এবং উদ্ভিদ প্রজাতির আবাসস্থল এই বন। শুধু পরিবেশের ফুসফুস নয়, বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি অপরিহার্য অংশ হলো বন। প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য বিমোচনে বনের ভূমিকা আজ অতুলনীয়।
তথাপি, বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই ভূমি ব্যবহার অনুশীলনের অভাবের কারণে বনগুলো অভূতপূর্ব হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে।
এ সমস্ত কারণে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১২ সালে ২১ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক বন দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করে। বনের গুরুত্ব এবং মানুষের পাশাপাশি তারা অন্যান্য যে সুবিধাগুলো প্রদান করে থাকে সে সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৩ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। এই দিবসটি উপলক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই বনায়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বন শুধু পরিবেশ নয়, অর্থনীতিরও একটি শক্তিশালী ভিত্তি। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘বন ও অর্থনীতি’ এই বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে, বন হচ্ছে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিশ্বব্যাপী বনভূমি প্রায় ৪.০৬ বিলিয়ন হেক্টর, যা পৃথিবীর মোট ভূমির প্রায় ৩১% জুড়ে বিস্তৃত। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১৬০ কোটি মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বনের ওপর নির্ভরশীল। কাঠ ও অকাঠজাত বনজ পণ্য থেকে শুরু করে পর্যটন এবং জৈব অর্থনীতি- সবক্ষেত্রেই এই নির্ভরতা প্রকট। বন কেবল গ্রামীণ অর্থনীতিই চাঙ্গা করে না, শহুরে জীবনেও এর প্রভাব সুস্পষ্ট।
এছাড়া বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অর্ধেকের বেশি প্রায় ৪৪ ট্রিলিয়ন ডলার প্রকৃতি ও বনের ওপর নির্ভরশীল। বন থেকে প্রাপ্ত কাঠ ও অকাঠজাত পণ্যের বার্ষিক চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৪ বিলিয়ন ঘনমিটার কাঠ উৎপাদিত হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ২০৫০ সালের মধ্যে এই চাহিদা আরও ১ বিলিয়ন ঘনমিটার বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধিই এই সম্ভাবনার চাবিকাঠি।
সম্প্রতি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বনায়ন ও বনজশিল্পে সরাসরি নিয়োজিত কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ। আর এই খাতে তৈরি হওয়া প্রতি ১০০টি চাকরি পরোক্ষভাবে আরও ৭৩টি কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে। আগামী এক দশকের মধ্যে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে প্রায় ১২০ কোটি যুবক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে, অথচ বর্তমান হিসাবে কর্মসংস্থান রয়েছে মাত্র ৪০ কোটি মানুষের। বনায়ন খাতই এই বিরাট চাহিদা পূরণের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।
বনায়ন অর্থনীতির একটি বড় অংশ রয়ে যায় অদৃশ্য। জাতিসংঘের বিশ্লেষণ বলছে, প্রচলিত অর্থনৈতিক হিসাবে শুধু নগদ লেনদেনকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু পরিবারের নিজস্ব ব্যবহারের জিনিস, অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান এবং ইকোসিস্টেম সার্ভিস (বাস্তুতন্ত্রের সেবা), যেমন পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ, মাটির উর্বরতা রক্ষা, কার্বন সংরক্ষণ এই মূল্যায়ন জাতীয় হিসাবে জুড়ে দেওয়া হয় না। ফলশ্রুতিতে বনায়ন খাতে বিনিয়োগ হয় না প্রত্যাশিত মাত্রায়।বাস্তুতন্ত্রের এই সেবাগুলো কৃষি, শিল্প ও নগর পরিকল্পনার ভিত্তি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, টেকসইভাবে উৎপাদিত কাঠ যদি ভবিষ্যতে ইস্পাত ও সিমেন্টের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে শুধু আফ্রিকা মহাদেশেই ২০৫০ সালের মধ্যে ৫ থেকে ১০ গিগাটন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। যা একসঙ্গে প্রায় ২৩০ কোটি গাড়ি রাস্তা থেকে কমিয়ে আনার সমান।
এটি যেমন জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সাহায্য করবে, তেমনি তৈরি হবে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান। বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, তবে এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ‘বাংলাদেশ ফরেস্ট ইনভেন্টরি’ (বাংলাদেশ বন জরিপ) থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। জরিপের ফলাফল বলছে, দেশের প্রায় ৬৪ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বন ও বৃক্ষসম্পদ থেকে উপকৃত হচ্ছেন। প্রাকৃতিক ভান্ডারে ভরপুর সুন্দরবন উপকূলীয় সম্প্রদায়ের বার্ষিক আয়ের প্রায় ৯ শতাংশ জোগান দেয়। বিশ্ব ঐতিহ্যের এই
ম্যানগ্রোভ বন শুধু অর্থনৈতিক সুরক্ষাই দেয় না, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও এটি দেশের অন্যতম ঢাল। জরিপে দেশে মোট ৩৯০টি বৃক্ষপ্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে, যা আমাদের জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধির প্রমাণ ।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ১৬ শতাংশ বনাঞ্চল ভূমিধস বা ক্ষয়ে আক্রান্ত। পাহাড়ি অঞ্চলের বন ধ্বংস যেমন ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে বন সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা জরুরি হয়ে পড়েছে ।
দেশের প্রধান বনাঞ্চলের মধ্যে আছে সুন্দরবন যা বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। প্রায় ৩৫ লাখ উপকূলীয় মানুষ এ বনের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে নির্ভরশীল। সুন্দরবনের পর্যটন খাত শুধু অর্থনৈতিক নয় বরং দেশ ও বহির্বিশ্বের পর্যটকদের এ বনের প্রকৃতি, মানুষ ও জীববৈচিত্র্যকে জানার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায়। এ বন বাংলাদেশকে বহির্বিশ্বে সুনামের সাথে পরিচিত করে। ম্যানগ্রোভ বন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় অঞ্চলকে রক্ষা করে যা অর্থনৈতিক ক্ষতি কমায়।
বনজ সম্পদ যেমন কাঠ, জ্বালানি, মধু, মোম, মাছ ইত্যাদি গ্রামীণ ও নগর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল। অনেক পরিবার তাদের আয়ের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অবনজ পণ্য থেকে পায়। জ্বালানী ও আসবাবপত্রের চাহিদা মেটাতে গ্রামীণ বনের অবদান অনস্বীকার্য। এগুলো ছাড়া আধুনিক অর্থনীতি কল্পনাই করা যায় না। অর্থাৎ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বন শুধু সম্পদ নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা অবকাঠামো (natural economic buffer)।
তথাপি, বর্তমানে বনভূমি হ্রাস, অবৈধ দখল, অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন বনকে ঝুঁকির অনেক মুখে ফেলছে। বৈশ্বিকভাবে প্রতিবছর বন উজাড়ের হার এখনও উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বন ধ্বংস রোধ এবং ক্ষয়ে যাওয়া বনাঞ্চল পুনরুদ্ধারে বর্তমানে বিনিয়োগ রয়েছে পর্যাপ্তের চেয়ে অনেক কম। এই পরিস্থিতি অর্থনীতির উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বিশেষতঃ কৃষি, পানি এবং জীবিকা নির্ভর খাতে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বনায়ন খাতকে অগ্রাধিকার দিলেও অর্থায়নের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।
এ কারণে আমাদের টেকসই অর্থনীতির জন্য বন সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরী। ২০২৬ সালের ‘বন ও অর্থনীতি’ প্রতিপাদ্য আমাদের একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়, আর তা হলো – বন সংরক্ষণ মানেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকা উচিত বন। শুধু পরিবেশের সংরক্ষণ নয়, এটি দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ। বনকে শুধু ‘সবুজ সম্পদ’ না ভেবে ‘অর্থনৈতিক অবকাঠামো’ হিসেবে গণ্য করে এ খাতে আরও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। টেকসই বন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে আরও বেশী বন সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে তাদের আয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
বনায়ন ও পুনঃবনায়ন কর্মসূচি জোরদার করা, কাঠশিল্প, ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার, বনজ পণ্যের মূল্য শৃঙ্খল উন্নয়ন, স্থানীয় জনগণের শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, প্রকৃতি-নির্ভর পর্যটন উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, বন ভিত্তিক কার্বন বাজার তৈরি, ইকোসিস্টেম সার্ভিস বা বাস্তুসংস্থান সেবার জন্য অর্থপ্রদান (Payment for Ecosystem Services), প্রযুক্তি-নির্ভর বন ব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি সম্ভাবনামুখী শিল্পকে সম্প্রসারণের মাধ্যমে ‘সবুজ অর্থনীতি’ গড়ে তুলতে হবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা-র তথ্যানুযায়ী, টেকসই বন ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করলে তা মোটা অঙ্কের অর্থনৈতিক মুনাফা দেয়। অন্যদিকে বন ধ্বংসের ফলে ভূমিক্ষয়, বন্যা এবং দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। তাই আজকের দিনে বন রক্ষা মানেই অর্থনীতি রক্ষা, এই সত্যটি উপলব্ধি করার সময় এসেছে।
পরিশেষে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ে বন সংরক্ষণ যেন শুধু কর্তব্য না হয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক একটি পন্থায় পরিণত হয়। কারণ একটি দাঁড়িয়ে থাকা, সমৃদ্ধিশীল গাছ শুধু পরিবেশের নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক অনন্য আর্থিক সুরক্ষা। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে বন সংরক্ষণ শুধু পরিবেশগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক কৌশল (economic strategy)। এই আন্তর্জাতিক বন দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত বন রক্ষা করব, অর্থনীতি শক্তিশালী করব, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখব।
লেখকঃ ডঃ মো. ওয়াসিউল ইসলাম, অধ্যাপক, ফরেস্ট্রি এন্ড উডটেকনলোজি ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।
খুলনা গেজেট/এএজে

