শুক্রবার । ৬ই মার্চ, ২০২৬ । ২১শে ফাল্গুন, ১৪৩২

রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, গুণের ভিত্তিতে সম্মাননার ধারা অব্যাহত থাকুক

পলাশ রহমান

সাহিত্য-সংস্কৃ‌তির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি বাংলাদেশের অন্য যে কোনো দলের চেয়ে অনেক বেশি উদার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে এতদিন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে দেশের কবি-সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একটি বড় অংশ কখনও তা স্বীকার করতে চাননি। বরং বিভিন্ন সময়ে জিয়া পরিবার ও বিএনপিকে ঘিরে তারা বিদ্বেষই বেশি উৎপাদন করেছেন।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অবদান ও উদারতা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা সাহিত্য অঙ্গনে খুব কমই দেখা যায়। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহনশীলতা, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং গুণিজনকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তুলে ধরার মানসিকতাও প্রায় সময় উপেক্ষিত হয়েছে। উল্টো জিয়া, খালেদা কিংবা তারেক রহমানকে ঘিরে নেতিবাচক বক্তব্যই বেশি প্রচার পেয়েছে।

সম্প্রতি কবি মোহন রায়হানকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার দেওয়ার, পরে স্থগিত এবং পুনরায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে। কিন্তু গুণিজনদের পুরস্কার দেওয়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়া-দু’জনই দলীয় পরিচয় নয়, কৃতিত্বকে প্রাধান্য দিয়ে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করতেন।

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা পুরস্কার প্রবর্তন করেন। প্রথম বছরেই মাওলানা ভাসানী ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের মতো ব্যক্তিত্বকে সম্মানিত করা হয়। তাঁর সময়েই স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন-রনদা প্রসাদ সাহা, কবি জসীমউদ্দীন, সমর দাশ, পটুয়া কামরুল হাসান, প্রমুখ। তাঁদের অনেকেই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু পুরস্কারের ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের বিএনপি’র কাছে গুণই ছিলো প্রধান বিবেচ্য।

১৯৭৬ সালে একুশে পদক প্রবর্তনের মাধ্যমেও জিয়াউর রহমান সংস্কৃতি অঙ্গনে স্বীকৃতির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন। প্রথম বছরেই একুশে পদক দেওয়া হয় সাহসিকা বেগম সুফিয়া কামালকে। একই বছরে সম্মানিত হন আবুল কালাম শামসুদ্দিন, কুদরাত-এ-খুদা, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। পরবর্তী সময়ে কবি শামসুর রাহমান, শহিদ আলতাফ মাহমুদ, জহির রায়হান, শিল্পী হামিদুর রহমান, মূর্তজা বশীর, রণেন কুশারী, মুস্তাফা নুরুল ইসলাম, শওকত আলী, রফিকুন নবী, জুয়েল আইচ, আহমদ ছফা, মুস্তাফা মনোয়ার, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদসহ বহু গুণিজন এ স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে বিএনপি’র ঘোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়া একই ধারা অব্যাহত রাখেন। স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করেন- অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, কবি শামসুর রাহমান, প্রয়াত জহির রায়হানসহ বহু কৃতী ব্যক্তিত্বকে। হাসান হাফিজুর রহমান, পণ্ডিত বারীণ মজুমদার, গণসংগীত শিল্পী আবদুল লতিফ, শহীদ আলতাফ মাহমুদ, কমরেড মনি সিংহসহ ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার ব্যক্তিত্বরাও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন খালেদা জিয়ার সরকারের সময়ে।

নিঃসন্দেহে পুরস্কারের তালিকায় দু-একটি বিতর্কিত নাম থাকতে পারে। তা নিয়ে সমালোচনা হওয়াও স্বাভাবিক। কিন্তু ভিন্নমতের কৃতী ব্যক্তিদের সম্মান জানানোর যে উদারতা জিয়া ও খালেদা জিয়া দেখিয়েছেন, তার স্বীকৃতি খুব কমই উচ্চারিত হয়েছে। বরং পুরস্কার গ্রহণকারী অনেকে তাঁদের সম্পর্কে কখনো রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে ইতিবাচক মূল্যায়ন করেননি।

কবি মোহন রায়হানকে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে তারেক রহমান- জিয়া এবং খালেদা জিয়ার সেই ধারা ফিরিয়ে এনেছেন। তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যদি শুরু থেকে আরও বিচক্ষণ ও সুসংগঠিত ভূমিকা পালন করতো, তাহলে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক এড়ানো সম্ভব হতো। নতুন সরকারের ভাবমূর্তি অহেতুক প্রশ্নের মুখে পড়তো না।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন