বাংলাদেশে নারীর নির্বাচন তথা রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও সামাজিক রূপান্তরের ফল। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান ছিল বহুমাত্রিক। যোদ্ধা, সংগঠক, আশ্রয়দাতা, তথ্য সংগ্রাহক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও তারা ছিলেন সক্রিয়। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমানাধিকারের স্বীকৃতি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু আইনি স্বীকৃতি ও বাস্তব রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মধ্যেকার ব্যবধানে নারীরা পিছিয়ে পড়ে। বর্তমান দেশের রাজনীতি-নির্বাচনে নারীর উপস্থিতি ক্ষেত্র বিশেষে দৃশ্যমান হলেও, তা চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়।
সম্প্রতি দেশে শিক্ষা, চাকরি, ব্যাবসা ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ যেভাবে বাড়ছে, রাজনীতিতে তাঁদের অংশগ্রহণ সেভাবে বাড়ছে না। যদিও দেশে একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, এমনকি সংসদের স্পিকারের দায়িত্বে নারীকে দেখা গেছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে নবম। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোয় কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণের কথা বলা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো দলই এ শর্ত পূরণে সক্ষম হয়নি।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা : ৫-লিঙ্গ সমতা অর্জন-বাস্তবায়নে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানের ১০ নং অনুচ্ছেদে জাতীয় স্তরের সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ আছে। ২০২৩ সালের জনশুমারি অনুসারে, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লক্ষ ৫০ হাজার ৫৩২। এরমধ্যে ৮ কোটি ১৭ লাখ ৬৯ হাজার ২৬৬ জন পুরুষ, যা মোট জনসংখ্যার ৪৯.৫১ শতাংশ। অন্যদিকে নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৮১ হাজার ২৬৬, যা মোট জনসংখ্যার ৫০.৪৯ শতাংশ। এ তথ্যানুসারে দেশে পুরুষের চেয়ে নারী সংখ্যা ১৬ লাখ ১২ হাজার বেশি। শতকরা হারে এ সংখ্যা ০.৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি হাজারে পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যা প্রায় দশজন বেশি।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সঙ্গে সংসদে নারীর উপস্থিতির সম্পর্ক স্পষ্ট। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে ভোটার সংখ্যা ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন। নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন, যা মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক। এছাড়া হিজড়া ভোটার ১২২০ জন। এবারই প্রথম হিজড়ারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে। এবারের নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। এরমধ্যে অন্তত ৩০টি দল কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। যদিও জুলাই সনদে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়নের বিষয়ে অঙ্গীকার ছিল।
নির্বাচন কমিশনের গেজেট অনুযায়ী, এ নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মধ্যে ৭ জন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। জয়ীদের মধ্যে ৬ জন বিএনপি, ১ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। গত পঁচিশ বছরে এ হার সর্বনিম্ন। নির্বাচনে ১ হাজার ৯৮১ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যার মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র ৮৬ জন। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর ৪.৮ শতাংশ। আর নির্বাচিত হওয়ার হার মাত্র ২.৩৪ শতাংশ। এ নির্বাচনের মোট প্রার্থীর সংখ্যার বিচারে নারীর অংশগ্রহণ কম থাকলেও, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে এবার নারীদের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে বিগত পাঁচটি নির্বাচনে নির্বাচিত নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ছিল। হিসাব অনুযায়ী ২০০৮ সালে ১৯ জন, ২০১৪ সালে ২৩ জন, ২০১৮ সালে ২২ জন, ২০২৪ সালে ১৯ জন নারী সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়।
বর্তমান সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ৫০। সে হিসাবে সংসদে মোট নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা হবে ৫৭, যা সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব হবে ১৬ শতাংশ। এছাড়া নির্বাচিত ৭ জন নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে তিনজন ঠাঁই পেয়েছেন মন্ত্রিসভায়। তাদের একজন পূর্ণ মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। অর্থাৎ, নির্বাচিত নারীদের ৪২.৮৬ শতাংশ এখন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। একটি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী হওয়া সত্ত্বেও কেবিনেটে তাদের এই নগণ্য উপস্থিতি প্রতিনিধিত্বমূলক নয়। এসব তথ্যই বলে দেয়, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নারীরা তুলনামূলক পিছিয়ে রয়েছে। যদিও বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী এবং ভোটার সংখ্যার দিক দিয়েও তারা এগিয়ে। কিন্তু সংসদের মতো বিধিবিধান প্রণয়নকারী জায়গায় তাদের প্রতিনিধিত্ব একেবারেই সীমিত।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে। ওই নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিলেন ১০১ জন, যা মোট প্রার্থীর ৫ শতাংশের বেশি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব ও নারীবান্ধব নীতির ঘাটতির কারণেই নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম। নির্বাচনী ব্যায়, সহিংস রাজনৈতিক পরিবেশ, সামাজিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করে। টিআইবি-এর গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতাকে সীমিত করে রাখছে।
এছাড়া, এবারের নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের সময় নারীবিদ্বেষী প্রচারণা ও নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ নারী প্রার্থীদের ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারীরা। বিশ্লেষকদের মতে, নারী প্রার্থী কম হওয়ার পেছনে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক কলাকৌশল। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন প্রক্রিয়াই নারীর অংশগ্রহণের বড় বাধা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে সাতজন নারী নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের শিক্ষাগত ও পেশাগত প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে জানা যায়,Ñতারা উচ্চশিক্ষিত, পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। কেউ আইনজীবী, কেউ শিক্ষাবিদ, কেউবা রাজনীতিবিদ। এমনকি, নারী প্রার্থীদের প্রায় ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর) বলে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া নারী প্রার্থীদের হলফনামা পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। আর মোট প্রার্থীর প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী ছিলেন কর্মজীবী। অর্থাৎ যোগ্যতার বিচারে তারা কেউ পিছিয়ে নেই। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গন বা দেশের সরকার কাঠামোয় তাদের অংশগ্রহণ সীমিত রয়ে গেছে। মজার বিষয় হলো, নির্বাচিত ৭ নারীর প্রায় সবাই রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা।
গবেষণা বলছে, যেখানে নারীর প্রতিনিধিত্ব বেশি, সেখানে সামাজিক খাতে বিনিয়োগ ও জবাবদিহিতা তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়। তাই রাজনীতি ও নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গনকে নারীবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা। এক্ষেত্রে জরুরি হলো নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাস বা পরিবার, অর্থ বা পেশিশক্তির ভিত্তিতে নয়, নারীর মূল্যায়ন হওয়া দরকার যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে। প্রার্থী মনোনয়নের সময়ও বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে। তাইওয়ানে রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীর জন্য বাধ্যতামূলক কোটা রয়েছে। সংবিধান ও নির্বাচনি আইনে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করায় দেশটির পার্লামেন্টে বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ নারী সদস্য রয়েছেন।
নারীর ক্ষমতায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি একটি সামগ্রিক প্রক্রিয়া। রাজনীতিতে নারীদের যোগ্য আসন দেওয়া, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের যুক্ত করা, এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবই একে অপরের পরিপূরক। নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠান নারী নেতৃত্ব বেশি কার্যকর ভূমিকার রাখতে পারে। নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ব্যতিক্রম নয়, বরং স্বাভাবিক হিসেবে সমাজে স্বীকৃতি দিতে হবে। নারীর সম্পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব ও নারীবান্ধব নীতির ঘাটতির কারণেই নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম। রাজনীতিতে, জনপ্রতিনিধিত্বে নারীর অংশগ্রহণ অধিকার। সেই অধিকারকে এগিয়ে নিতে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার থাকা উচিত। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে নেতৃত্বে নারীর ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরা জরুরি।
লেখক : অতিরিক্ত পরিচালক, উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম

