তিন বছরে বন্ধ হয়েছে ৪ শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা: বাণিজ্যমন্ত্রী

গেজেট প্রতিবেদন

দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে গত তিন বছরে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত ৪০২টি পোশাক কারখানাসহ ৪ শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সদস্যভুক্ত ২৮২টি এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সদস্যভুক্ত ১২০টি কারখানা রয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর নামের তালিকা সংগ্রহের কাজ চলছে বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে জামায়াতের সংসদ সদস্য রুহুল আমিনের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে পোশাকশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি, কারখানা বন্ধ হওয়ার কারণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অবস্থান নিয়ে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়েও তথ্য তুলে ধরা হয়।

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, গত কয়েক বছরে দেশের পোশাকশিল্প একাধিক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে অনেক কারখানা উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারেনি। বিশেষ করে করোনা মহামারির প্রভাব কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মন্দার মতো পরিস্থিতি বৈশ্বিক পোশাকবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এর পেছনে একক কোনো কারণ নয়; বরং করোনা মহামারির অভিঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার কমে যাওয়ার মতো একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।

বিজিএমইএর ২২ জুন প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ওপর একদিকে যেমন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির চাপ রয়েছে, অন্যদিকে প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সুবিধার ব্যবধানও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপের সঙ্গে ভারত ও ভিয়েতনামের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য নতুন প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।

এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতাদের নিজস্ব মনিটরিং ব্যবস্থার সুবিধার জন্য ছোট ও মাঝারি আকারের কারখানাগুলোতে রপ্তানি আদেশ দিতে অনাগ্রহও দেশের পোশাকশিল্পে প্রভাব ফেলছে বলে সংসদে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। ফলে বড় কারখানাগুলোর পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও রপ্তানি আদেশ সংকটের মুখে পড়ছেন।

এদিকে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও বড় একটি চ্যালেঞ্জের কথা সংসদে তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হবে। এর ফলে উন্নত দেশগুলোর ট্রেডিং স্কিমের আওতায় বাংলাদেশ বর্তমানে যে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পেয়ে থাকে, তার একটি বড় অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব দেশের রপ্তানি খাতে পড়তে পারে এবং প্রায় ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এই সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। ইতোমধ্যে জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ সম্পাদিত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট বা সিইপিএ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ বা আরসিইপি, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও চীনসহ পোশাক ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনাময় দেশ ও জোটের সঙ্গে ইপিএ, সিইপিএ বা এফটিএ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখা এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য বাণিজ্য সুবিধা হারানোর প্রভাব কমিয়ে আনা। একই সঙ্গে নতুন বাজার সৃষ্টি এবং বিদ্যমান বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

বিএনপির সংসদ সদস্য জাহান্দার আলী মিয়ার এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় সংসদে পোশাকশিল্পের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা সম্পর্কে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প থেকে ৪৪ হাজার ৫০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে চলতি বছরের জুলাই মাসে পোশাক রপ্তানি থেকে ৩ হাজার ৮৮৬ দশমিক ৭২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়েছে।

তবে একদিকে রপ্তানি আয়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা শিল্পটির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সবকিছুর ওপরই এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের প্রশ্নের জবাবে দেশের ভোজ্যতেল পরিস্থিতি নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় সম্পূর্ণটাই আমদানিনির্ভর। বর্তমানে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২২ থেকে ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের প্রয়োজন হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম, সরবরাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় পরিস্থিতির ওপর দেশের ভোজ্যতেল বাজার অনেকাংশে নির্ভরশীল।

অন্যদিকে কুষ্টিয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল গফুরের প্রশ্নের জবাবে দেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও কিছু ইতিবাচক তথ্য তুলে ধরেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ২২ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পান রপ্তানি করেছে। বাংলাদেশের পান লেবানন, ওমান, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হচ্ছে।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন