বুধবার । ১০ই জুন, ২০২৬ । ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ই-হেলথ কার্ড পাবেন ২৫ লাখ মানুষ

গেজেট প্রতিবেদন

সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ২৫ লাখ মানুষের জন্য ই-হেলথ কার্ড কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির অংশ হিসাবে প্রথম পর্যায়ে খুলনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী ও নোয়াখালী জেলায় এই পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এজন্য আগামী বাজেটে ১৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নাগরিকরা সহজে স্বাস্থ্যসেবা পাবেন। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং ধীরে ধীরে দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার ভিত্তি গড়ে উঠবে। তবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য তথ্যের নিরাপত্তা রক্ষা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে পরিচিত করানোর মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থবিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ই-হেলথ কার্ড হবে একজন নাগরিকের ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয়পত্র। এতে রোগীর চিকিৎসা ইতিহাস, রোগ নির্ণয়ের তথ্য, প্রেসক্রিপশন, টিকাদান তথ্য, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বরের সঙ্গে সংযুক্ত এই কার্ডের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত সেবা পাওয়া যাবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, প্রথম পর্যায়ে কার্ডধারীরা সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মাতৃ ও শিশুসেবা, টিকাদান, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড সুবিধা পাবেন। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবিমা বা সরকারি স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে এই কার্ড যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। সম্প্রতি বাজেটসংক্রান্ত এক আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার তুলে ধরে বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবাকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসাবে বিবেচনা করছে। ই-হেলথ কার্ড প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য তথ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনতে চাই। এতে চিকিৎসাসেবা আরও সহজ, দ্রুত এবং জবাবদিহিমূলক হবে। ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি মানুষকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন এবং পরিচালন ব্যয়সহ মোট ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ১ দশমিক ০১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা বা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। নতুন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৭ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকার ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক কার্যক্রম, ৫ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার সেকেন্ডারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, ১২ হাজার কোটি টাকার জরুরি চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সম্প্রসারণ প্রকল্প, ৩ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকার নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন কর্মসূচি এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ। যদিও বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা ব্যয়ের চাপের কারণে প্রতিবছর অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। ই-হেলথ কার্ড কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারি সেবার দক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ই-হেলথ কার্ড প্রকল্প স্বাস্থ্য খাতে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হতে পারে। বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসাবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি। ই-হেলথ কার্ড প্রকল্প সফল হলে ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবিমাভিত্তিক ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু কার্ড বিতরণ করলেই হবে না। হাসপাতালের সক্ষমতা, চিকিৎসক ও নার্সের প্রাপ্যতা, ওষুধ সরবরাহ এবং তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

জানা গেছে, পাইলট প্রকল্প চলাকালে পাঁচ জেলার অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করা হবে। সেবার মান, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নাগরিক সন্তুষ্টি এবং ব্যয়-সাশ্রয়ের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে পরবর্তী ধাপে অন্যান্য জেলায় সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেবে সরকার। সফল বাস্তবায়নের পর কয়েক বছরের মধ্যে জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত ডিজিটাল স্বাস্থ্য পরিচয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন