বুধবার । ১০ই জুন, ২০২৬ । ২৭শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ফয়েজ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ দুদকের

গেজেট প্রতিবেদন

বিটিসিএলের ফাইভ-জি প্রকল্পে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে তার দুদকের তদন্তেও হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় তাকে আসামি করে মামলার সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের পাঁচ সদস্যের অনুসন্ধানকারী দলের তৈরি প্রতিবেদনটি এরই মধ্যে সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা পড়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র এশিয়া পোস্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

দুদকের নতুন কমিশন গঠনের পর প্রতিবেদনটি কমিশনে উঠবে। এরপর আনুষ্ঠানিক মামলা রুজু হবে।

দুদকের অনুসন্ধানে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এই বিশেষ সহকারীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে।

যে প্রকল্প ঘিরে বিতর্ক

‘ফাইভজি উপযোগীকরণে বিটিসিএলের অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি প্রথমে হাতে নেওয়া হয় শেখ হাসিনার আমলে। এক পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগের মুখে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।

জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান নাহিদ ইসলাম। তিনি প্রথমে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও পরে দুর্নীতির বিষয়টি জানতে পেরে পিছু হটেন।

পরে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। তার মেয়াদে একের পর এক নানা বিতর্কিত পদক্ষেপ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

বাতিল আদেশ পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা

প্রকল্পে চুক্তি অনুযায়ী ‘ফ্যাক্টরি ফিজিক্যাল প্রি-অ্যাকসেপ্টেন্স টেস্ট’ সম্পন্ন হয়নি। এ কারণে জাহাজীকরণ ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া আটকে যায়।

এ অবস্থায় পূর্বে বাতিল হওয়া সরকারি আদেশ পুনরায় জারি করতে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে প্রস্তাব পাঠান ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেই প্রস্তাবে দুর্নীতির অভিযোগ ও দুদকের তদন্তের বিষয়টি গোপন রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, হুয়াওয়েকে এলসির বিপরীতে অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ করে দেওয়া। তবে প্রধান উপদেষ্টা সেই প্রস্তাবে অনুমোদন দেননি।

দুদকের তদন্তে সরাসরি হস্তক্ষেপ

অনুসন্ধান প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিটিসিএলের ক্রয় কার্যক্রমে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন (পিপিএ)-২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (পিপিআর)-২০০৮ লঙ্ঘনের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান চলছিল। সে সময়েই চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের অনুকূলে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব।

২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ থেকে দুদক ও দুদক চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, অনুসন্ধান চলমান থাকলেও এফপিএটি (মান যাচাই পরীক্ষা) সম্পন্নের উদ্যোগ বন্ধ রাখা হবে না।

অর্থাৎ, তদন্ত উপেক্ষা করে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় ওই চিঠিতে। শুধু এতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। একই দিনে তিনি সরাসরি দুদক চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মৌখিকভাবে অনুমোদন আদায়ের চেষ্টা করেন। কিন্তু সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

তৎকালীন দুদক সচিব খোরশেদা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘এই প্রকল্পটি চালিয়ে নিলে আইনের ব্যত্যয় ঘটবে।’

এফপিএটি ছাড়াই জাহাজীকরণের নির্দেশ

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, এফপিএটি সম্পন্ন না হওয়ার প্রকৃত কারণ গোপন রেখে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। এরপর চুক্তির শর্ত ভেঙে এফপিএটি ছাড়াই জাহাজীকরণের নির্দেশ দেন ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। এর মাধ্যমে এলসিতে অর্থ পরিশোধের পথ উন্মুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।

দুদক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনই নয়; বরং এটি ছিল অনুসন্ধান চলমান থাকা অবস্থায় একটি বিতর্কিত ক্রয় কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা।

বিষয়টি নিয়ে দুদকের আপত্তি সত্ত্বেও থামেননি ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। ২০২৫ সালের ২২ জুন সরকারি লেটারহেড ব্যবহার করে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে আরেকটি চিঠি পাঠানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই চিঠির মাধ্যমে দুদকের অনুসন্ধান কার্যক্রমকে প্রভাবিত ও বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করা হয়। এটি স্পষ্টত আইনের লঙ্ঘন।

আলোচনায় চীন সফর

গত বছরের ৪ মে জারি করা সরকারি আদেশে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের চীন সফরের অনুমোদন দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল আইসিটি অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইন্টেলিজেন্স ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন।

৬ থেকে ১০ মে পর্যন্ত এই সফর অনুষ্ঠিত হয়। সঙ্গে ছিলেন একান্ত সচিব এএসএম জামশেদ খন্দকার এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি তানভির আলি।

সরকারি আদেশে উল্লেখ ছিল, সফরের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করবে চাইনিজ এন্টারপ্রাইজেস অ্যাসোসিয়েশন মেম্বার্স ইন বাংলাদেশ (সিইএবি)।

দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিটিসিএল প্রকল্পের দরদাতা ও কার্যাদেশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে ওই সংগঠনের সদস্য। প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সদস্যভুক্ত সংগঠনের অর্থায়নে সফরের বিষয়টিকে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে দুদক।

যে ধারায় মামলার সুপারিশ

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের নানা কর্মকাণ্ড পেশাগত অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। পরস্পর যোগসাজশে নিজে বা অন্যকে লাভবান করার অসৎ উদ্দেশ্যে অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়নি। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের মাধ্যমে কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

ফলে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪০৯, ৪২০ ও ৫১১ ধারার পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় মামলা রুজু করার সুপারিশ করা হয়েছে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন