দক্ষিণাঞ্চলের চামড়ার বাজারে এবারও ধস নেমেছে। ন্যায্যমূল্য না পেয়ে অনেকেই হতাশ হয়েছে। অনেকে বিক্রি করতে না পেরে মাটিতে পুঁতেছে, অনেকেই নদীতে ফেলে দিয়েছে।
খুলনা মহানগরীর মুন্সিপাড়া থেকে গরুর ৬টি চামড়া পাওয়ার হাউজ মোড়ে আসেন আবরার। ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে না পেরে চামড়া নিয়ে ফিরতে হয় তাকে। তিনি খুলনা গেজেটকে বলেন, দাম নেই। সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী চামড়ার দাম তো দিচ্ছেই না, বরং ৮০০-১২০০ টাকা মূল্যের জায়গায় ২০০-৪০০ টাকায় কিনতে চাইছে। এই দামে একটি চামড়া বিক্রি করলে তো যাতায়াত ভাড়াই ওঠে না। আমি ৫০০ টাকা করে বলেছি। তারা মাত্র ১৫০০ টাকা বলে ছয়টি চামড়া। তাই ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।
সোনাডাঙ্গা এলাকার জুবায়ের একটি কোরবানীর চামড়া নিয়ে দর কষাকষি করছিলেন। এসময় বিক্রেতা তাকে প্রথমে ১৫০ টাকা দিতে চায়। তবে তিনি চামড়া দিতে রাজি হয়নি। পরবর্তীতে তর্কবিতর্কে জড়িয়ে ৩০০ টাকায় বিক্রি করেন সেই চামড়াটি। সঙ্গে একটি ছাগলের চামড়া বিনামূল্যে দিতে হয়েছে তাকে।
নগরীর পাওয়ার হাউজ মোড়ের ব্যবসায়ী আবু মুছা বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী চামড়ার দাম ৭০০-৮০০ টাকা হবে। তবে আমরা ৪০০ টাকায় কিনছি। এরসঙ্গে অন্তত ২০০ টাকার লবণ ও পরিবহণ খরচ আছে। আর গরুর নানা রোগের কারণে চামড়া নিতে চায় না ট্যানারি ব্যবসায়ীরা। ফলে লোকসানে পড়তে হয়। তারপরও ঝুঁকি নিয়ে চামড়া কিনতে হচ্ছে।
যশোর থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, রাজারহাট দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম বড় চামড়ার হাট। যশোরসহ খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, ঈশ্বরদী ও নাটোরের ব্যবসায়ীরা এখানে চামড়া বেচাকেনা করতে আসেন। পবিত্র ঈদুল আজহার পর শনিবার এখানে ছিল প্রথম হাট। তবে এদিন ব্যবসায়ীরা পানির দামে চামড়া বিক্রি করে পুঁজি হারিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। হাটে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তারা চামড়ার কাঙ্খিত দাম পাননি। আর পাইকারদের দাবি, তারা মান অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত দামেই চামড়া কিনেছেন।
দূর-দূরান্ত থেকে চামড়া নিয়ে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলেছেন, মান ও আকারভেদে গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ১৫০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। আর ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে প্রতি পিস মাত্র ১০ থেকে ২০ টাকায়। ফলে চামড়া কেনা, লবণ দেয়া ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে তারা লাভ তো দূরের কথা পুঁজি হারিয়েছেন।
মৌসুমি ব্যবসায়ী অনেকেই ঋণ নিয়ে চামড়া কিনে এখন বিপাকে পড়েছেন। বাগেরহাটের চামড়া ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন বলেন, প্রায় একশ’ কিলোমিটার দূর থেকে চামড়া নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে ক্রেতা নেই বললেই চলে। গরুর চামড়া প্রতি পিস ১৫০ থেকে ২৫০ টাকার বেশি বলা হচ্ছে না। এতে তার সবই লোকসান হচ্ছে।
যশোরের বাঘারপাড়ার ব্যবসায়ী নারায়ণ শীল বলেন, সরকার গরুর চামড়ার মূল্য ৫৭ থেকে ৬২ টাকা ফুট নির্ধারণ করলেও বাজারে ৪০ টাকা ফুটেও বেচাকেনা হয়নি। আর ছাগলের চামড়ার তো কোনো দামই নেই।
নড়াইলের ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন বলেন, ৩৭৫ পিস চামড়া নিয়ে রাজারহাটে এসেছিলাম। সবচেয়ে ভালো চামড়াটি বিক্রি হয়েছে ৯০০ টাকায়। বাকি চামড়াগুলো পানির দামে বিক্রি করতে হয়েছে।
অবশ্য বিক্রেতাদের এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি পাইকারি ক্রেতারা। তাদের বলেছেন, ভালোমানের চামড়া সরকার নির্ধারিত দামেই কেনা হয়েছে। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী অভিজ্ঞতার অভাবে কাটা, ছেঁড়া বা রোগাক্রান্ত নিম্নমানের চামড়া কিনে আনছেন, যার কারণে তারা লোকসানের মুখে পড়ছেন।
হাটের পাইকার আব্দুল হান্নান বলেন, শনিবারের বাজারে ভালো ও খারাপ-দুই ধরনের চামড়াই এসেছে। ভালো চামড়া ভালো দামেই বিক্রি হয়েছে। তিনি নিজে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকায় একটি চামড়া কিনেছেন। ফুট হিসেবে হিসাব করলে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়েও বেশি দাম দেয়া হয়েছে।
অপর আড়তদার আলাউদ্দিন মুকুল বলেন, ঈদের পর বেশিরভাগ ব্যবসায়ী চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করেছেন। প্রথম হাটে অনেকে বাজার পরিস্থিতি দেখতে কিছু চামড়া এনেছেন। আগামী মঙ্গলবার ও শনিবারের হাটে চামড়ার আমদানি বাড়বে।
সাতক্ষীরা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক, জেলা ও শ্যামনগর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সাতক্ষীরা জেলার সর্বত্রই পবিত্র ঈদুল আযহায় কোরবানিকৃত পশুর চামড়া বিক্রি না হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষসহ মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং দ্বিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। কোনোভাবেই বিক্রি করতে না পেরে লোকসান আর দুর্গন্ধের হাত থেকে বাঁচতে জেলার বিভিন্ন স্থানে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার খবর পাওয়া গেছে। উপকূলীয় এলাকা থেকে শুরু করে জেলা শহর এবং অন্যান্য উপজেলাতেও চামড়ার বাজারের এই একই করুণ চিত্র দেখা গেছে।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়ন থেকে সংগ্রহ করে আনা চামড়া গত শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত শ্যামনগর উপকূলীয় প্রেসক্লাবের সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। শুধু শ্যামনগর নয়, সাতক্ষীরা শহরের সুলতানপুর বড়বাজার, তালা উপজেলা সদর এবং কলারোয়ার বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে চামড়া স্তূপ আকারে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ক্রেতা না থাকায় অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী চামড়া রাস্তায় ফেলে রেখে চলে যান।
সাতক্ষীরা শহরের রাজার বাগান এলাকার খলিলুর রহমান বলেন, ঈদের দ্বিতীয় দিন দুটি ছাগল কুরবানি দিয়েছি। দাম নেই, নেওয়ার লোক নেই। সেজন্য কেটে পুকুরে দিয়ে দিয়েছি মাছের খাওয়ার জন্য।
সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া এলাকার কোরবানি দাতা আলহাজ আমজাদ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে কসাই দিয়ে গরুর চামড়া ছাড়ালাম। কিন্তু বাজারে কোনো ক্রেতা নেই। ৫০ টাকা দিয়েও কেউ চামড়া নিতে রাজি হয়নি। শেষে বাধ্য হয়ে নিজেদের আঙিনায় গর্ত খুঁড়ে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেছি।
তালা উপজেলার ধানদিয়া গ্রামের কোরবানি দাতা শফিকুল ইসলাম বলেন, “ছাগলের চামড়া তো কেউ ফ্রিতেও নিতে চাচ্ছে না। দুর্গন্ধ ছড়ানোর ভয়ে তা খালের পাড়ে ফেলে দিতে হয়েছে।
বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট জামে মসজিদের ইমাম ও বাগে জান্নাত হাফিজিয়া মাদ্রাসার খতিব হাফেজ রেজাউল করিম বলেন, সারাদিন ও সারারাত ভর অপেক্ষা করেও কেউ চামড়া নিতে আসেনি। পরে দুর্গন্ধ ছড়ানোর ভয়ে মাদ্রাসা চত্বরেই চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলতে হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার চামড়ার বাজার সবচেয়ে খারাপ। আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে নামমাত্র মূল্যে চামড়া কিনতে চাইছে।
সাতক্ষীরা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির কয়েকজন সদস্য জানান, সরকার কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ হিসেবে তারা বলেন, চলতি মওসুমে লবণের দাম অতিরিক্ত বেশি এবং পরিবহন খরচ প্রায় দ্বিগুণ। সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও জেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত আড়ত না থাকায় লোকসানের আশঙ্কায় তারা চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে মাঠপর্যায়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুদ্দুজ্জামান কনক বলেন, কোরবানির আগে এতিমখানা কর্তৃপক্ষের সাথে কথা হয়েছিল তারা চামড়াগুলো সংরক্ষণ করে রাখবে। পরবর্তীতে দুই এক দিন পরে বিক্রি করার কথা। কিন্তু এভাবে নষ্ট করার কথা ছিল না। বিষয়টা আমি গুরুত্ব সহকারে দেখছি।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা: এফ এম মান্নান কবীর জানান, চামড়া একটি জাতীয় সম্পদ। এভাবে চামড়া অবিক্রীত থেকে নষ্ট হওয়া বা মাটিতে পুঁতে ফেলা অত্যন্ত দুঃখজনক। চামড়া সংরক্ষণের জন্য স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত লবণের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রুত ট্যানারি মালিকদের সাথে আড়তদারদের সমন্বয় করা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
খুলনা গেজেট/এনএম

