বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জ¦ালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা এক রূপান্তর ঘটিয়ে ফেলেছি। দেশীয় গ্যাসের ওপর নির্ভরতা থেকে আমরা আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি-এর ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি। বলা হচ্ছে, দেশীয় মজুত কমে যাওয়ায় গ্যাস ঘাটতি মোকাবেলার জন্য আমরা এমনটি করছি। আমরা ধরে নিয়েছি, ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের বিদ্যুৎ চাহিদা হবে আনুমানিক ৩৪ হাজার মেগাওয়াট; যা মেটাতে রাষ্ট্র ১০ হাজার মেগাওয়াট এলএনজি-ভিত্তিক সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
কিন্তু প্রশ্নটি হচ্ছে, আমদানি-নির্ভর এই পণ্যটির সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য আমাদের অর্থনীতি কী প্রস্তুত? বাজারের চাহিদামতো বৈদেশিক মুদ্রার জোগান কী আমরা দিতে পারবো? অন্যদিকে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিদ্যুতের চাহিদা যা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা-কি যৌক্তিক? ২০২৬ সাল শেষের দিকে, এখন আমাদের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট। সামনের চার বছরে কী আমাদের চাহিদা দ্বিগুণ অর্থাৎ আরও ১৭ হাজার মেগাওয়াট বৃদ্ধি পাবে? না-কি, অতিরিক্ত চাহিদা নির্ধারণ করে আমরা বিশেষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়ার সকল রাস্তা খুলে দিচ্ছি?
এলএনজি আমদানি করা মানেই এরজন্যে বিশাল অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। সমুদ্রপথে এই তেল আমদানি করা হয়; যা খালাস, সংরক্ষণ ও গ্যাসে রূপান্তর করার জন্য বড় ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন হয়। বর্তমানে, দেশের মোট গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ মহেশখালী দ্বীপের উপকূলে নোঙর করা ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ)-এ প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। এখানে রয়েছে দুটো টার্মিনাল। একটি, মহেশখালী ফ্লোটিং এলএনজি (এমএলএনজি), যার ধারণ ক্ষমতা ৬০০ এমএমসিএফডি, আমেরিকার এক্সেরারেট এনার্জি এটি পরিচালনা করে। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে চালু হওয়া এই টার্মিনালটি ১৫ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, সামিট এলএনজি টার্মিনাল। সামিট গ্রুপও এক্সেলারেট কোম্পানির মাধ্যমে এটি পরিচালনা করে। ৫০০ হতে ৫৫০ এমএমসিএফডি ধারণক্ষম এই টার্মিনালটি চালু হয়েছে ২০১৯এর এপ্রিলে। এটিও ১৫ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ।
এই অফশোর সরবরাহ ব্যবস্থাটি মেঘনাঘাট হাবের মূল শক্তি। যেখানে অনেকগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। এখানেই রিলায়েন্স মেঘনাঘাট সিসিপিপি (৭১৮ মেগাওয়াট), ইউনিক মেঘনাঘাট পাওয়ার প্ল্যান্ট (৫৮৪ মেগাওয়াট), এবং সামিট মেঘনাঘাট-২ পাওয়ার প্ল্যান্ট (৫৮৩ মেগাওয়াট) বিদ্যমান। এই কেন্দ্রগুলি বেসলোড বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, তবে এদের অবস্থান ও কার্যকারিতা কয়েকশ’ কিলোমিটার দূরে – বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়-প্রবণ অঞ্চল -মহেশখালিতে অবস্থিত একটি সংকীর্ণ অফশোর সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
বর্তমানে মহেশখালির বিকল্প হিসেবে আরও ভাসমান টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যার একটি পায়রায় নির্মাণের জন্য প্রাথমিক কথাবার্তা চূড়ান্ত হয়েছে। সুন্দরবনের কাছে হিরণপয়েন্ট ও মোংলায় আরও দুটো টার্মিনাল তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। বলাই বাহুল্য যে, উপকূল থেকে শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) দ্বারা পরিচালিত একটি ‘এনার্জি হাইওয়ে’র প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য এই নেটওয়ার্কটির প্রয়োজন হলেও যার জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রকৌশলগত এবং আর্থিক চাপ সামাল দিতে হবে।
আমরা জানি, এফএসআরইউ থেকে গ্যাস মহেশখালী জিরো পয়েন্টে (কলাড়িয়া চর) যায়। এই পর্যায়টি ৩০-ইঞ্চি মহেশখালী-আনোয়ারা লাইন (৫০০ এমএমসিএফডি ক্ষমতা) এবং এর সমান্তরালে ২০২১ সালে চালু হওয়া একটি ৪২-ইঞ্চি লাইন (১,২০০ এমএমসিএফডি) দ্বারা সংযুক্ত, যা স্থলভাগে সহজে গ্যাস পৌঁছে দেয়। আর একটি ১৮১ কিলোমিটার দীর্ঘ ৩৬-ইঞ্চি দক্ষিণ-পূর্ব আর্টেরিয়াল ট্রাঙ্কলাইন, যা আনোয়ারা (চট্টগ্রাম) সিজিএস-কে বখরাবাদ হাবের সাথে সংযুক্ত করে। চারটি প্রধান নদী পারাপার এড়ানোর জন্য এই অংশে উন্নত হরাইজন্টাল ডিরেকশনাল ড্রিলিং (এইচডিডি) পদ্ধতির প্রয়োজন হয়েছিল। এছাড়াও ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৪২-ইঞ্চি লুপ (বখরাবাদ-মেঘনাঘাট-হরিপুর), যাকে ডেডিকেটেড পাওয়ার সাপ্লাই লিংক বলা হচ্ছে, তা সরাসরি ছয়টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উচ্চ-চাপের ফিড সরবরাহ করে। বিপুল পরিমাণ প্রবাহ সামাল দিতে, জিটিসিএল প্ল্যান্টের চাহিদার সাথে সঞ্চালন চাপ সমন্বয় করার জন্য মিরসরাই এবং বখরাবাদে স্বয়ংক্রিয় টাউন বর্ডার স্টেশন (টিবিএস) এবং টেলিমেট্রি পরিকাঠামো ব্যবহার করে। ২০২৯ সালের মধ্যে ১.৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে মহেশখালী-বখরাবাদ ২৯৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সম্প্রসারণ লাইন প্রস্তুত করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য হলো প্রতিদিন ১,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা। যদিও এই পাইপলাইনগুলো ভৌত প্রবাহ বাড়াতে কাজ করবে, তবে তা আমাদের জাতীয় কোশাগারের অবস্থা খুবই নাজুক করে দেবে।
প্রকৃতপক্ষে, এই সরবরাহ অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য আমাদের বিপুল আমদানি ব্যয় মেটাতে হবে। যা আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে। ২০৩০ সালের পর এলএনজি-র ব্যবহার ৬০ শতাংশের বেশী বাড়তে থাকলে ডলারের দাম বৃদ্ধি বা আমাদের টাকার মান কমলে এবং বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় আমাদের ঝুঁকি আরও অনেক পরিমাণে বাড়বে। বেসলোড কষ্ট সিনারিও অনুযায়ী (ব্রেন্ট-সূচক অনুযায়ী প্রতি এমএমবিটিইউতে ১২ ডলার), বার্ষিক ব্যয় প্রায় সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলার (১,০৪৪ বিলিয়ন টাকা)। তবে, একটি ভলাটিলিটি শক (স্পট প্রাইস প্রতি এমএমবিটিইউতে ২০ ডলার) এই ব্যয় ১৪ বিলিয়ন ডলারে (১,৭১৯ বিলিয়ন টাকা) পৌঁছে দিতে পারে।
আমরা এখুনি বৈদেশিক দেনায় ভারাক্রান্ত। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি প্রায় ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকার বেশি)। জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ— প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বা তারও বেশি— ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় হয়ে থাকে। যা টাকার অঙ্কে লক্ষাধিক কোটি টাকা। ইতোমধ্যেই আমাদের জাতীয় বাজেটের প্রধান ব্যয় -খাত হচ্ছে বৈদেশিক দেনা পরিশোধ। এ অবস্থায় ২০২৬ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আনুমানিক ৩০-৪৫ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হবে, যা রিজার্ভ নিঃশেষ করে দিতে পারে এবং বর্তমান ঋণ সংকটকে আরও তীব্রতর করবে।
আবার, রাষ্ট্র প্রতি ঘনমিটার ৫০ টাকা দরে এলএনজি কিনে তা ৩০ থেকে ৩১ বা সাড়ে ৩১ টাকায় বিক্রি করে। এই অবস্থা কতদিন চলতে পারে, সেই শোরগোল তুলে ব্যবধান কমাতে সরকারকে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়াতে হবে, যা সামাজিক ও শিল্পক্ষেত্রে অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করবে। আমদানি শুল্ক পরিশোধের জন্য পেট্রোবাংলার বৈদেশিক ঋণ এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গ্যারান্টির উপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা একটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ফাঁদের জড়িয়ে যাওয়ার সকল লক্ষণ দেখা দিয়েছে। আমরা কী মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে এই ঋণ-ফাঁদে জেনেশুনে জড়িয়ে যাচ্ছি!
এই অবকাঠামোর বিশেষত : বঙ্গোপসাগরের অফশোর এফএসআরইউ গুলো বর্ষার কারণে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটিমাত্র প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা ঝড় রিগ্যাসিফিকেশন বন্ধ করে দিতে পারে, যার ফলে তাৎক্ষণিক ও ব্যাপক লোডশেডিং হতে পারে। যা আগস্ট ২০২৬এ আমরা দেখেছিও। আবার, জ¦ালানির উচ্চমূল্য সরকারকে আমদানি কমাতে বাধ্য করতে পারে, যার ফলে টার্মিনালগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে কম ব্যবহৃত হবে; অর্থাৎ শত কোটি ডলারের প্ল্যান্টগুলো বসে থাকবে, অথচ চুক্তি অনুযায়ী স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (আইপিপি) ভাড়া পরিশোধ (ক্যাপাসিটি চার্জ) করতে হবে। যাতে বিদ্যুৎ তৈরি না হলেও কোশাগার হতে টাকা বেরুতে থাকবে।
অথচ আমরা এলএনজি’র ওপর নির্ভরশীলতা না বাড়িয়ে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি খাত প্রসারে আরও অধিকতর মনোযোগী হতে পারতাম। এমনকি নবায়নযোগ্য জ¦ালানি প্রসারে আমাদের যে লক্ষ্যমাত্রা, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেদিকেও আমরা যথাযথ নজর নিচ্ছি না। বাড়ির ছাদে সোলার বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আহ্বান জানিয়ে পরিবারগুলোকে আমরা বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে পারতাম। সম্প্রতি বাড়ির ছাদে সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রণোদনা হিসেবে তিন বছরের জন্য বিদ্যুৎ কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ আইপিপিগুলোকে আমরা সারা বছর বিদ্যুৎ কেনার নিশ্চয়তা দিচ্ছি। বিদূতের প্রয়োজন না হওয়ায় আইপিপি বসিয়ে রাখলেও তার মূল্য পরিশোধ করছি (ক্যাপাসিটি চার্জ)। ধনী ও বড় ব্যাবসায়িক উদ্যোক্তাদের আমরা এত সুবিধা দিতে পারলে, রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির অর্থ তাদেরকে দিতে পারলে, আমরা ক্ষুদ্র, পারিবারিক উদ্যোক্তা, সাধারণ মানুষকে কেন এই সুবিধা বা ভর্তুকি দিতে পারছি না! আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় ক্ষুদ্র বা প্রান্তিক মানুষদের জন্যে এত অবহেলা কেন? রাষ্ট্র কী শুধু ধনী, ব্যবসায়ীদের তোষণ করবে?
গৌরাঙ্গ নন্দী : স্বাধীন সাংবাদিক।
খুলনা গেজেট/এনএম

