ডাক্তার দ্বীন মোহাম্মদ খোকা। বর্তমানে বাগেরহাট জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (সিসি) হিসেবে কর্মরত আছেন। ৩৪ বছরের কর্মময় জীবন শেষ করে ৪ মাস পরে অবসরে যাবেন। ৫৯ বছর বয়সী এ ডাক্তার ১৯৯১ সালে এমবিবিএস পাস করেন।
গত ২১ সেপ্টেম্বর তার নামে ডুমুরিয়া থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা হয়েছে। অথচ ওই সময় তিনি ইউনিসেফের স্বাস্থ্য বিষয়ক ৪ দিনের একটি কর্মশালায় রিসোর্সপারসন হিসেবে বাগেরহাটে দ্বায়িত্বরত ছিলেন।
শুধু তিনি নয়, ডুমুরিয়া ডিগ্রী কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল বিষ্ণু প্রসাদ মল্লিক, আঠারোমাইল সৈয়দ ঈসা এন্ড টেকনিক্যাল কলেজের সহকারি অধ্যাপক জি এম ফারুক হোসেন, পল্লী শ্রী কলেজের অধ্যক্ষ সুভাস সরদার, চুকনগর ডিগ্রী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এ বি এম শফিকুল ইসলাম, বানিয়াখালী মাওঃ ভাসানী মেমোরিয়াল ডিগ্রী কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপক কে এম হযরত আলী, ডুমুরিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাবেক ৬ বারের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাহাঙ্গীর আলমকেও ওই মামলায় আসামি করা হয়েছে।
আলোচিত এ মামলা থেকে বাদ যায়নি ৮০ বছর বয়সী সাবেক ইউপি সদস্য সরদার মাহামুদ আলী, সত্তরোর্ধ অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধা মঞ্জুর রশীদ রনো, শাহানাজ হোসেন জোয়াদ্দার, শেখ হেফজুর রহমান, আবু বক্কার খানও। এ মামলায় মোট ৪৭ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়েছে।
মামলার বাদি আব্দুর রব আকুঞ্জি। যিনি রঘুনাথপুর ইউনিয়ন বিএনপির বর্তমান সভাপতি। অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগের আমলে যিনি স্থানীয় আওয়ামী লীগের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যবসা করেছেন বহাল তবিয়তে। নিয়মিত যাতায়াত ছিল আওয়ামী লীগ অফিসে এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সাথেও। ওই মামলার স্বাক্ষী আব্দুর রবের আপন ভাই আব্দুল হকও আওয়ামী লীগের আমলে স্থানীয় সরকারী দলের নেতাদের কল্যাণে অত্যন্ত ফুরফুরে মেজাজে কাজ করেছেন ইউপি সদস্য হিসেবে।
ডুমুরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ খন্দকার হাফিজুর রহমান এ মামলাটি দায়ের করেছেন ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। বাদির দাখিলকৃত দরখাস্থ কোন প্রকার তদন্ত ছাড়াই তিনি মামলাটি রুজু করেন। তিনি দাবি করেছেন বাদির দেওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে মামলাটি নেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ডুমুরিয়া থানা বিএনপির সভা অনুষ্ঠিত হয়।
একাধিক সূত্র জানায়, ওই সভায় অনেক বক্তাই এ হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া কেন হয়েছে, তা বাদী আব্দুর রবের কাছে জানতে চান। বাদী বলেন, আমি ১০/১২ জনের নামে মামলা দেওয়ার জন্য তালিকা দিয়েছি। ওসি কিভাবে ৪৭ জনকে আসামি করলেন সে সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।
ডুমুরিয়ার সর্বত্র এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এ হয়রানীমূলক মামলা নিয়ে। তাদের দাবি, আবারও মামলা বাণিজ্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি চক্র। ওই চক্রের অনেকে এসব মামলাকে পুঁজি করে এলাকায় চাদাঁবাজি শুরু করেছে। তাছাড়া ব্যক্তি আক্রোশেও অনেককে মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে।
এ ব্যাপারে রঘুনাথপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুর রব আকুঞ্জি বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ১৮ সেপ্টেম্বর রঘুনাথপুর কুমরাইল গ্রামে হারুন অর রশিদের গোয়াল ঘরে কাফনের কাপড় পরে শপথ করতে কিছু দুর্বৃত্ত উপস্থিত হয়। ছবি দেখে দলের পেছনের সারির ১০ জন নেতাকর্মীর নামে আমি মামলা থানায় দায়ের করি।
তিনি আরও বলেন, খোকাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। তার নামে মামলা হয়েছে কি না তা আমার দেখে বলতে হবে।
ডুমুরিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতিকে আসামি করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি হতবাক হয়ে বলেন, আমি যাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছি, তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের নাম ছিল না। বাকীদের আসামি করেছে থানা পুলিশ।
ডুমুরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ হফিজুর রহমান বলেন, মামলা আসামিদের সব নামই বাদী দিয়েছেন। বাদীর মোবাইল চেক করলেই সব জানতে পারবেন। সেই পড়ে মামলার তিনটি স্থানে স্বাক্ষর করেছেন। এখন সে অনেক কিছুই বলবে। কোনো নিরীহ মানুষ এ মামলায় যাতে হয়রানি না হয় সেজন্য তাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। ওসি আমার সাথে কথা বলেছেন। এ বিষয়ে আমি সার্বিক খোঁজ নিতে বলেছি। কি হয়েছে এবং কিভাবে মামলাটি হল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। খুলনা প্রেসক্লাবের সভাপতি এ বিষয়ে আমাকে অবগত করেছেন। বিষয়টি দেখব বলে আমি তাকে আশ্বস্ত করেছি।
এ ব্যাপারে খুলনা প্রেসক্লাবের সভাপতি মোস্তফা সরোয়ার বলেন, ঘটনার সাথে যারা জড়িত নয় তাদেরকে হয়রানি করার জন্য আসামি করা হলে বিষয়টি উদ্বেগজনক। ডুমুরিয়া থানায় অতীতে বিভিন্ন সময় মিথ্যা মামলা দিয়ে শত শত মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে। সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে বিষয়টি উদ্বেগের ও দুঃখজনক। বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে এখন সহজে সবাইকে সনাক্ত করা সম্ভব।
যারা ওই ঘটনার সাথে জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে বলেন, বিশেষ করে ডুমুরিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলমের নামে মামলা করায় জনমনে একটি ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবাদিক সমাজ এ ধরনের আচারণে হতবাক হয়েছেন।
খুলনা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক ও ডুমুরিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক সাবেক চেয়ারম্যান মোল্লা মোশারফ হোসেন মফিজ বলেন, আমি শুনেছি কোমরাইলের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। ওই ঘটনায় যারা জড়িত তাদের অনেকের নাম মামলায় আসেনি। আবার যারা ওই ঘটনায় জড়িত না, এমন অনেকের নাম এ মামলায় অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। আমরা প্রশাসনকে বলেছি, দেশকে অস্থিতিশীল করতে যারা নানা অপকর্মে জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে। অকারণে কেউ হয়রানি না হয় সে ব্যাপারেও প্রশাসনকে সর্বোচ্চ দৃষ্টি রাখার আহবান জানানো হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এএজে

