একটি সিন্ডিকেটের সহযোগিতায় খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে ৩ মাস ২৬ দিন আগে চলতি বছরের ১৯ মে যোগদান করেন ডা. শেখ মোঃ মোশাররফ হোসেন। বিনিময়ে সিন্ডিকেটকে বিনিয়োগ করতে হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। এর আগে খালিশপুরস্থ পোর্ট হেলথ অফিসার হিসেবে তিনি কর্মরত ছিলেন। ওই দিন বিকেলে যোগদান করেই রাতে নিরালা আবাসিকের ১৬ নম্বর রোডে খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা খান শফিউর রহমানের বাসায় সিন্ডিকেটের বৈঠকে তিনি যোগ দেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বাক্ষর জাল করে কর্মকর্তাদের বদলি করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অপরাধে দুদকের মামলার আসামি ও কারাভোগকারী বহুল আলোচিত ফরিদ আহমেদ মোল্লা। বর্তমানে তিনি পাবনা মানসিক হাসপাতালে স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কর্মরত আছেন। ওই বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন সিভিল সার্জন অফিসের হিসাব রক্ষক মাহফুজুর রহমান, বক্ষব্যাধি হাসপাতালের শামীম আহসান, শাহারিয়ার রাসেল ও ড্রাইভার আফসার আলী। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরের দিনই স্বাস্থ্য দপ্তরের ৬ কর্মকর্তাকে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। তার পরের দিন আরও ৯ জনকে বদলি করা হয়। ওই সব পদে তার সিন্ডিকেটের সদস্য ও পছন্দের ব্যক্তিদের পদায়ন করা হয়। যেমন সিভিল সার্জন অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা খান শফিউর রহমানকে তার দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। উচ্চমান সহকারী আনোয়ার হোসেনকে ডুমুরিয়া থেকে এনে প্রধান সহকারীর দায়িত্ব দেওয়া হয়, হিসাব রক্ষক হিসেবে আনা হয় শাহারিয়ার রাসেলকে ফকিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে। তিনি পরিচালকের অর্থ লেনদেনে বিশেষ ভূমিকা রাখার কারণে এবং দাপ্তরিক কাজ না বোঝার জন্য সোহেল মোল্লাকে বদলি করে আনা হয়েছে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে। আর সার্বিক কাজ করার জন্য বদলি করে আনা হয়েছে যশোর জেনারেল হাসপাতাল থেকে গনেশ চন্দ্র মন্ডলকে।
পরিচালক হিসেবে যোগদানের পরেই ৭৯০ নম্বর আদেশ দিয়ে যাত্রা শুরু। গত সপ্তাহ পর্যন্ত তার স্বাক্ষরিত আদেশ নম্বর হচ্ছে ১৪৭৫। প্রথম আদেশের চিঠি বাইরে থেকে কম্পোজ করে আনা হয় বলে সূত্রটি নিশ্চিত করেছে। এদিকে এ হিসেব অনুযায়ী ৩ মাস ২৫ দিনের কার্যকালে তিনি ৬৮৫টি লিখিত আদেশ প্রেরণ করেছেন। ওই আদেশ পর্যালোচনায় দেখা যায় অর্ধেকের বেশি হচ্ছে বদলি, আর বদলি প্রত্যাহারের আদেশ।
দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৩ শতাধিক বদলি ও বদলি বাতিল সংক্রান্ত প্রত্যেকটি আদেশে কমপক্ষে লাখ টাকা, কোন কোন আদেশে তার চেয়েও বেশি টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কাজ করতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করতেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা শফিউর রহমান ও শাহারিয়ার রাসেল। তবে এক অদৃশ্য শক্তির নির্দেশে পরিচালকের ডিম পাড়া হাঁস শফিউরকে নিজ হাতেই বদলির আদেশ দিয়েছেন পরিচালক। বর্তমানে তিনি যশোর সিভিল সার্জন অফিসে কর্মরত। এখন সব বিষয়ে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করছেন শাহারিয়ার রাসেল। পাবনায় কর্মরত ফরিদ মোল্লা খুলনায় আসার জন্য মূলত একটি সিন্ডিকেট আগে থেকেই গঠন করা হয়। ওই সিন্ডিকেট প্রত্যেকে অর্থ জোগান দিয়ে পরিচালককে ওই পদে আনতে চেষ্টা করেছে। যে কারণে পরিচালক তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছেন। নিজেকে সৎ কর্মকর্তা দাবি করলেও প্রতিদিন বিকেলে শুরু হয় বদলি ঠেকাতে আবার বদলীকৃতদের আদেশ প্রত্যাহারের জন্য সিন্ডিকেট বৈঠক।
গত রবিবার স্বাস্থ্য দপ্তরের অদূরে গিয়ে দেখা যায়, বদলি হওয়া দু’কর্মকর্তা ওই দপ্তরের বাইরে চায়ের দোকানে বসে পরিচালকের এক সিন্ডিকেট সদস্য’র সাথে দেনদরবার করছেন। এ সময়ে বলতে শোনা যায়, স্যার এত কম টাকায় আপনাদের পূর্বের জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়ার আদেশ দিবেন না। ওই সদস্যের মাধ্যমে কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্যাশিয়ার সৌমেন্দ্রনাথ সাহা পরিচালক এর দপ্তরে বদলি হওয়ার পরে আবার পূর্বের স্থলে ফেরত যান। বিনিময়ে তাকে গুনতে হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। কচুয়া থেকে কয়রায় বদলি ঠেকাতে ওই সদস্যকে ৫০ হাজার টাকা দেয় মোঃ কামরুজ্জামান সরদার। দাবি ছিল দেড় লাখ টাকা। চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দেওয়ায় তাকে কয়রায় বদলি করা হয়।
পরিচালকের বর্তমান সিন্ডিকেটে একজন নারী সদস্য রয়েছেন। যার প্রভাবে সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষক (চলতি দায়িত্ব) মোঃ তরিকুল ইসলামকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়মিত হিসাব রক্ষক করার আশ্বাসে ১২৫১ নম্বর স্মারকে ৬ আগস্ট খুলনা পরিচালকের দপ্তরে ক্যাশিয়ার হিসেবে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তাকে আবারও ১৩৫৫(৬) নম্বর স্মারকে ২০ আগস্ট পূর্বের কর্মস্থলে ফেরত পাঠানো হয়। বর্তমানে দেড় লাখ টাকা নিয়ে তরিকুলের সাথে ওই মহিলা সদস্যের দেনদরবার চলছে।
খুলনা গেজেট/এএজে

