জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের কিছু ইতিবাচক সংশোধনের প্রস্তাব করা হলেও কমিশনের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হচ্ছে না বলে দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।সংস্থাটির দাবি, নির্বাহী বিভাগের প্রভাবের ঝুঁকি, সরকারি কর্মকর্তাদের কমিশনে প্রেষণে নিয়োগ এবং আর্থিক স্বাধীনতার পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকায় স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা অধরাই থেকে যাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে এসব কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
জাতীয় সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির পর্যালোচনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬-এ প্রস্তাবিত সংশোধনীর প্রতিক্রিয়ায় এমন দাবি করে টিআইবি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশন সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন হবে না, এমন সুস্পষ্ট বিধান না রাখা, চাকরিরত সরকারি কর্মচারীদের প্রেষণ, লিয়েন বা অবৈতনিক ছুটিতে কমিশনার হওয়ার সুযোগ এবং বাছাই কমিটিতে স্পিকার, দুই মন্ত্রী, সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে রাখার ফলে নির্বাহী বিভাগ তথা ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র প্রভাবের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
এ ছাড়া কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারি কর্মচারী প্রেষণে নিয়োগ এবং কমিশনের ব্যয় ও বরাদ্দ ব্যবহারে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক স্বাধীনতার সুরক্ষা না থাকায় কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করে টিআইবি।
সংস্থাটি বলছে, কিছু ইতিবাচক সংশোধনের প্রস্তাবও এসেছে। এর মধ্যে আদিবাসী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বাধ্যবাধকতা, ঋণখেলাপি ব্যক্তিকে কমিশনার হওয়ার অযোগ্য করা এবং সামরিক ছাড়া অন্য আটককেন্দ্র পরিদর্শনে পূর্বানুমোদনের শর্ত বাদ দেওয়ার বিষয়গুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে তারা। তবে এসব পরিবর্তনের পরও কমিশনের মৌলিক স্বাধীনতার প্রশ্নে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রেও বিলটির সমালোচনা করেছে টিআইবি।
সংস্থাটির মতে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের ধারা ১৯-এ শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে কমিশন নিজে সরাসরি অনুসন্ধান ও তদন্ত না করে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা প্রতিষ্ঠানের কাছেই প্রতিবেদন চাইবে, এই মূল ব্যবস্থা বহাল রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্তের এখতিয়ার সংকুচিত করে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদননির্ভর করার ফলে এ বিধান ২০০৯ সালের আইনের তুলনায়ও দুর্বল এবং প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সংকট রয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
টিআইবি দাবি করেছে, ধারা ১৪(৩)-এ অভিযুক্ত বাহিনীকে নিজ সদস্যের বিরুদ্ধে তদন্ত থেকে বিরত রাখা হলেও অন্য শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের হাতে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। অতীতে অধিকাংশ গুমের ঘটনায় বিভিন্ন শৃঙ্খলা, পুলিশ, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান সেই একই প্রাতিষ্ঠানিক বলয় থেকে কতটা স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবে দুর্বল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত শুধু ন্যায়বিচার ব্যাহত করবে না। এর ফলে ভুক্তভোগী গুমের শিকার হিসেবে স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ এবং তার পরিবারের সম্পত্তি ব্যবহার ও উত্তরাধিকারসংক্রান্ত অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের ক্ষেত্রেও সংসদীয় কমিটির প্রস্তাবিত সংশোধনগুলোকে অনেকাংশে ‘কসমেটিক’। ধারা ৪-এর লিখন পুনর্বিন্যাস ছাড়া স্বাধীন তদন্ত, জবাবদিহি বা ভুক্তভোগীর অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যত কোনো মৌলিক সংশোধনের সুপারিশ করা হয়নি। গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ (আইসিপিপিইডি)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গুমের সংজ্ঞা আরও পূর্ণাঙ্গ করা প্রয়োজন। সরকারি কর্মচারী ও শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, উপদেষ্টা বা রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রভাবশালী মহলের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততাও সংজ্ঞায় স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া বা তার পরিণতি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান অব্যাহত রাখা এবং পরিবারকে নিয়মিত অগ্রগতি জানানোর ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের সুরক্ষা প্রস্তাবিত বিলে রাখা হয়নি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনা ছিল বিল দুটির মৌলিক দুর্বলতা সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও অংশীজনদের বারবার তুলে ধরা মূল কৌশলগত উদ্বেগগুলো বহাল রয়েছে। বিল দুটি তড়িঘড়ি কণ্ঠভোটে পাস না করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি ধারা ও প্রস্তাবিত সংশোধনীর ওপর সংসদের সব সদস্যের অর্থবহ আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
খুলনা গেজেট/এএজে

