পাউবো-ইউপি’র রশি টানাটানিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেই, আতঙ্কে দেড় শতাধিক পরিবার

বেতনার তীর রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিনেরপোতা ব্রিজের পূর্ব পাশে জেলেপাড়া এলাকায় বেতনা নদীর তীর রক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে নদীর প্রবল স্রোতের টান ভাঙন ক্রমেই বিস্তৃত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ সংস্কারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে রশি টানাটানির কারণেই ভাঙনকবলিত এলাকায় সংস্কারকাজ শুরু হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।

এদিকে নদী ভাঙন অব্যাহত থাকায় বিনেরপোতা জেলেপাড়া এলাকায় বসবাসকারী দেড় শতাধিক পরিবার নদীগর্ভে বসতভিটা ও সম্পদ হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন রোধ করা না গেলে বর্ষার পানির চাপ ও নদীর প্রবল স্রোতে বাঁধের আরও বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিনেরপোতা ব্রিজের কাছে বেতনা নদীর পশ্চিম তীরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি দখল করে শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে ‘হাসান ফুড এন্ড বেভারেজ’-এর তিন ইউনিটের একটি বড় কারখানা। নদী খননের সময় ওই প্রতিষ্ঠানকে রক্ষার জন্য নদীর পূর্ব তীরে বিনেরপোতা গ্রামের জেলাপাড়া এলাকার দিকে তুলনামূলক বেশি খনন করা হয়েছে। এভাবে অপরিকল্পিতভাবে নদী খননের ফলে নদীর পানির প্রবাহের গতিপথ ও চাপের পরিবর্তন হয়েছে। এতে পানির স্রোত সরাসরি জেলেপাড়া এলাকার বাঁধে আঘাত করছে। ফলে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে বাঁধের ভাঙন দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।

অপরদিকে ভাঙনকবলিত বাঁধের দায়িত্ব কারা এ নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। ফলে ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। যে কারণে ভাঙনকবলিত এলাকার বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হচ্ছে না।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, “বিনেরপোতা এলাকায় বেতনা নদীর ভাঙনের বিষয়টি আমরা অবগত আছি। কিন্তু যেসব পয়েন্টে ভাঙন লেগেছে, ওই বাঁধটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন নয়। যে কারণে ভাঙন পয়েন্টের বাঁধ মেরামতে আমরা কোনো উদ্যোগ নিতে পারছি না। তবে বেতনা নদী খননের সময় তিনি ওই স্টেশনে দায়িত্বে ছিলেন না বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ আব্দুল আলিম ভাঙনকবলিত বেড়িবাঁধটি ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন বলে স্বীকার করে বলেন, “নদীভাঙন প্রতিরোধের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। বার বার বলা স্বত্বেও নদীভাঙন প্রতিরোধে পাউবো সেখানে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে।” এ ছাড়া নদীভাঙন রোধে কাজ করার মতো ইউনিয়ন পরিষদের পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই বলে জানান তিনি।

এদিকে দুই দপ্তরের বক্তব্যে বিপাকে পড়েছে এলাকাবাসী। পাউবো বলছে, “ভাঙনকবলিত বাঁধ তাদের আওতাধীন নয়। অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদ বলছে, বাঁধটি তাদের আওতাধীন হলেও নদীভাঙন প্রতিরোধের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। ফলে দুই পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের কারণে বাস্তবে ভাঙন প্রতিরোধে কে কাজ করবে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। জরুরি ভিত্তিতে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।”

স্থানীয় বাসিন্দা অজয় কুমার বিশ্বাস বলেন, “বেতনা নদীর ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অবসান হওয়া দরকার। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো দ্রুত যৌথভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বাঁধের মালিকানা ও দায়িত্বের বিষয়টি স্পষ্ট করুক। একই সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনকবলিত অংশে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে দুই পক্ষের এই ‘রশি টানাটানি’ অব্যাহত থাকলে একদিকে যেমন বাঁধের ভাঙন বাড়বে, অন্যদিকে তেমনি ঝুঁকির মুখে পড়বে জেলেপাড়ার দেড় শতাধিক পরিবার। তাই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

এবিষয়ে সদর ইউএনও অর্নব দত্ত জানান, বেতনার ভাঙনে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে স্থানীয় গ্রামবাসী আমার কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছে। নিজে ভাঙন এলাকা পরিদর্শন যাবো, এরপর ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন