দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তির পথ থেকে ধীরে ধীরে সরে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা চুক্তি জোরদার এবং দূরবর্তী দ্বীপগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্র মোতায়েনের মতো পদক্ষেপ নেওয়ায় জাপানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে উত্তর কোরিয়া।
নতুন সরকারি মূল্যায়নে চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকির বিষয়ে সতর্ক করার পর মঙ্গলবার জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, জরুরি ও সংকটময় পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সামরিক শক্তি বাড়ানো দরকার। এর জবাবে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে দেশটির নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং বলেছেন, পিয়ংইয়ংয়ের নেতারা জাপানের অতিরিক্ত সামরিকায়নের বিকল্পের প্রস্তুতি নেবে; যা স্পষ্টতই জাপানের বদলে যাওয়ার কারণে ঘটছে।
কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সিতে (কেসিএনএ) প্রকাশিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্র জাপান একটি যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রে রূপ নেওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের মদদে পরিচালিত ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক পদক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে টোকিওর সাম্প্রতিক টমাহক দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং মে মাসে ফিলিপাইনে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ মহড়ায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন কিম।
তিনি বলেন, টোকিও আগাম বা পূর্ব সতর্কতামূলক আক্রমণের সক্ষমতা অর্জনের নীতি নির্ধারণে এগোচ্ছে। জাপানের এই সামরিক অগ্রগতি যদি গুরুতর হুমকি তৈরি করে, তাহলে আমরা মোটেও নীরব দর্শক হয়ে থাকব না।
বুধবার (৫ আগস্ট) জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বার্তা সংস্থা এএফপিকে নিশ্চিত করে বলেছে, গত সপ্তাহের টমাহক পরীক্ষা ছিল জাপানের এ ধরনের প্রথম পরীক্ষা।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আত্মসমর্পণের আগে পুরো কোরিয়া অঞ্চল জাপানের দখলে ছিল। আত্মসমর্পণের পর ৩৮ ডিগ্রি অক্ষরেখা বরাবর পুরো কোরীয় উপদ্বীপ দুটি আলাদা রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায়।
সেই নৃশংস ঔপনিবেশিক শাসনের তিক্ত ইতিহাস এখনো উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া—দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতিতেই গভীর প্রভাব ফেলে চলেছে। বিবৃতিতে কিম বলেন, ছলচাতুরি ও আগ্রাসী মনোভাবের উত্তরাধিকার বহনকারী এই সামরিকবাদীরা যদি মারাত্মক সব অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, তাহলে অপ্রীতিকর কিছু ঘটবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আত্মসমর্পণের পর থেকেই জাপান মার্কিন সামরিক ঘাটির জন্য নিজেদের ভূমি উন্মুক্ত রেখেছে। দেশটি ২০২৫ সালে সামরিক বাজেট ৯ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ হাজার ২২০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে; যা তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৪ শতাংশ। এটি ১৯৫৮ সালের পর সর্বোচ্চ।
উত্তর কোরিয়ার প্রধান মিত্র চীনও সম্প্রতি জাপানের এই তথাকথিত নতুন সামরিকায়ন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। টোকিওর কট্টরপন্থী নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি গত নভেম্বরে এক বক্তৃতায় ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন, চীন তাইওয়ান দখলে পদক্ষেপ নিলে জাপানি সেনাবাহিনী তার জবাব দিতে পারে। এরপর থেকেই বেইজিং-টোকিও সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে তা দখলের পথও খোলা রেখেছে।
অন্যদিকে, পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরিধি নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় ২০১৯ সালে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শীর্ষ বৈঠক ভেস্তে যায়। এরপর থেকে পিয়ংইয়ং বারবার নিজেদের চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয় পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে আসছে।
সূত্র: এএফপি
খুলনা গেজেট/এএজে

