স্মৃতিতে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান

জুলাই যোদ্ধাদের গৌরবময় ভূমিকা

কাজী মোতাহার রহমান

চব্বিশের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে স্মরণীয় অধ্যায়। ৬৯ ও ৯০ এর ছাত্রনেতাদের উত্তরসূরিরা এ আন্দোলনকে বেগবান করে। জেঃ আইয়ুব, জেঃ এরশাদের মতো শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসান হয়। এ প্রেক্ষাপট তৈরির পেছনে যারা ভূমিকা রেখেছেন জুলাই যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাদের গৌরবময় ভূমিকা।

প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিম। বরিশাল জেলার উজিরপুর গ্রাম পৈতৃক নিবাস। জন্মেছেন ১৯৬০ সালের ১ জানুয়ারি। পিতা আব্দুল করিম ও মাতা আনোয়ার বেগম। তেজগাঁ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে এসএসসি, নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি, বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং এবং কুয়েট থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ঢাকার মগবাজারে বড় হয়েছেন। ১৯৯১ সালে খুবিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদেন। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর খুবির উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন।

জুলাইতে শিক্ষক আন্দোলন শুরু হলে সশরীরে অংশগ্রহণ করেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান। ১৯ জুলাই খুবি প্রাঙ্গণে গায়েবানা জানাজায় পুলিশ বাধা দিলে তিনি সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিবাদ করেন। একপর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি এবং খুবি প্রশাসন কর্তৃক কালো তালিকাভুক্ত হন। খুবি ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারী ছাত্রদের নানা কৌশল সম্পর্কে পরামর্শ দেন। এ আন্দোলনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তার অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। স্বৈরশাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সফল সংগঠক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। খুবির প্রধান ফটক মীর মুগ্ধ তোরণ নামকরণের অন্যতম উদ্যোক্তা। তার সন্তান আতিকা তাসনিম কোটাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

প্রফেসর ফারুখে আযম মোঃ আব্দুস ছালাম : সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার দূর্গাপুর গ্রামের সন্তান। জন্মেছেন ১৯৬৭ সালের ১৬ নভেম্বর। আব্দুস সোবহান মাস্টার তার পিতা, আর রহিমা খাতুন মা। ১৯৮৩ সালে আশাশুনি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, ১৯৮৫ সালে আশাশুনি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, ১৯৮৯ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান), ১৯৯০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৯-৯০ শিক্ষা বর্ষে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর মনোনয়নে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ- জাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯০ সাল স্বৈরশাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সফল ছাত্রনেতা। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করেন। আশাশুনি ফ্রেন্ডস স্পোর্টিং ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

১৯৯৬ সালে সরকারি কলেজের চাকুরিতে যোগদান করেন। সেই থেকে ঝিনাইদহ সরকারি লালন শাহ কলেজ, সাতক্ষীরা কলেজ, ঠাকুরগাঁ সরকারি মহিলা কলেজ, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ মহাবিদ্যালয়, বাগেরহাট সরকারি মহিলা কলেজ, বাগেরহাট সরকারি পিসি কলেজ ও বিএল কলেজে শিক্ষকতা করেন। ২০২৩ সালে প্রফেসর হিসেবে পদোন্নতি পান। এ সময়ে বিএল কলেজে অর্থনীতি বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের ৭ মার্চ থেকে সরকারি হাজি মুহাম্মদ মুহসিন কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরুতেই প্রত্যক্ষভাবে ছাত্র সমাজকে সমর্থন দেন। একাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে চাইলে তিনি ছাত্রদের আন্দোলনে অংশ নিতে উৎসাহিত করেন। জেলা প্রশাসনের আহ্বানে ৩০ জুলাই মুহসিন কলেজে খুলনা নগরীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি এ সভার সিদ্ধান্ত পরোক্ষভাবে উপেক্ষা করেন। ৩ আগস্ট সোনাডাঙ্গা থানা থেকে শিক্ষার্থী নাফিস মাহমুদকে মুক্ত করে নিয়ে আসেন। সরকারি সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীদের আইসিটি, গারহস্থ্য ও পরিসংখ্যান বিষয়ে ব্যাবহারিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে শিক্ষার্থীদের বিরত রাখেন। ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ নাইমকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। নানা ধরনের পোস্ট দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাকে নিয়ে গর্ব করেন। আন্দোলনকারীরা এ যুগের সাহসী শিক্ষক বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি যশোর শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে পালন করছেন।

প্রফেসর ড. নাজমুস সাদাত শুভ : খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি এন্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষক। আগস্ট পরবর্তী ছাত্র বিষয়ক পরিচালক। নগরীর নিরালা এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস, জন্মেছেন হাজী মহসিন রোডের বাড়িতে। মোঃ শাজাহান তার পিতা আর মরহুমা জাকিয়া আক্তার হোসেন তার মা। মাতৃকোলে ভূমিষ্ঠ হন ১৯৭৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর। খুলনা জিলা স্কুল থেকে ১৯৯২ সালে এসএসসি, ১৯৯৪ সালে সরকারি বিএল কলেজ থেকে আইএসসি, ১৯৯৯ সালে খুবি থেকে ফরেস্ট ট্রিতে স্নাতক (সম্মান) ও ২০০১ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ২০১৩ সালে জার্মান থেকে পিএইচডি করেন। ২০০২ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৩ সালে প্রফেসর হিসেবে পদোন্নতি পান। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনে বিশ্বাসী। ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলনে প্রথম সারিতে স্থান করে নেন।

ন্যাশনাল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন। সশরীরে ছাত্র শিক্ষক আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ায় গোয়েন্দা নজরদারিতে পড়েন। খুবি কর্তৃপক্ষ তাকে কালো তালিকাভুক্ত করে। ৩ জুলাই থেকে ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন। ৯ জুলাই খুবির শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকদের সমন্বয় করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৬ জুলাই খবির হাদি চত্বর ও জিরো পয়েন্টে ছাত্রদের আন্দোলনে শিক্ষকদের অংশগ্রহণে তার ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। ৩১ জুলাই গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রদের মুক্ত করতে থানায় যান। ২ আগস্ট মাথায় লাল কাপড় বেঁধে ক্যাম্পাসে মানববন্ধন কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন। আন্দোলনকারীদের অন্ন, অর্থ ও খাবার পানি দিয়ে সহযোগিতা করেন। তিনি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রফেসর এস এম তৌহিদুজ্জামান : সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার বাগমারা গ্রামের সন্তান। জন্ম ১৯৭৪ সালের ১ মার্চ। ওমর আলী সরদার তার পিতা আর জাহানারা বেগম তার মা। তিনি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করতেন। রাষ্ট্র বিজ্ঞানের শিক্ষক। চাকুরি জীবনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কলেজ, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি পাইওনিয়ার মহিলা মহাবিদ্যালয়, নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজ, সরকারি সুন্দরবন আদর্শ মহাবিদ্যালয় ও দিনাজপুর ফুলবাড়ী কলেজে ছিলেন। ভিন্ন আদর্শ লালন করায় ছয় বছর ওএসডি ছিলেন। ২০২৪ পট পরিবর্তনের পর যশোর শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সফল সংগঠক হিসেবে সকল মহলে স্বীকৃতি পেয়েছেন। বিপ্লবী তৌহিদ হিসেবে এখন তার পরিচিতি। আন্দোলনে ছাত্রসমাজকে বুদ্ধি, পরামর্শ ও কলাকৌশল দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। তার সহযোদ্ধা ছিলেন খুবির শিক্ষার্থী মিনহাজুল আবেদীন সম্পদ ও আয়মান আহাদ।

৩১ জুলাই ছাত্র আন্দোলন প্রতিহত করতে পুলিশ গুলি চালালে আন্দোলনকারীদের নিরাপদ স্থানে নিতে তিনি সহযোগিতা করেন। গণআন্দোলনের এক পর্যায়ে ছাত্রদের সাথে লবনচরা থানা দখল নিতে সক্ষম হন। শিববাড়ী, জিরো পয়েন্ট, খুবি ক্যাম্পাস, ময়লাপোতা ও সাত রাস্তার মোড় কর্মসূচিতে তিনি ছিলেন নিয়মিত যোদ্ধা। ২ আগস্ট গল্লামারীতে পুলিশ গুলি, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে ছাত্রদের নিরাপদ স্থানে নিতে সহায়তা করেন। ৩১ জুলাই গভীর রাতে গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রদের মুক্ত করতে খুলনা সদর থানায় ছুটে যান। এ সময়ে তার স্ত্রী নিলিমা খাতুন সাথে ছিলেন। বাংলাদেশ মাদ্রাসা বোর্ডের রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন