মধ্য শ্রাবণ অতিক্রান্ত। মেঘভারনত আকাশ। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো বা ক্ষণকালের জন্য সূর্যোদয়। মেঘ রৌদ্রের লুকোচুরি! এমন দিনে জীবনের স্মৃতিচারণ কতই না মধুর! বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবন। বয়স প্রায় ৭৫ অতিক্রম করলাম। আমার একমাত্র সম্বল দেশপ্রেম। দেশপ্রেমের কারণে, নানা জনের কাছে এই ৭৫ বছর বয়সে বহুত নিন্দা-ধিক্কার এবং কুৎসিত গালি গঞ্জনা শুনতে হয়েছে।
এমনই এক পেশায় জীবন কাটালাম। যেখানে জনগণের জন্য, জনগণের প্রতি, জনগণের দায়বদ্ধতা থেকে টেনশন ক্রস টেনশনে অনেকদিন কেটে গেছে। দেশের সেরা বিশ্ব বিদ্যাপীঠ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও সরকারি চাকরি, পদ পদবি ঘৃণা করেছি। ঘুস-দুর্নীতি, অনিয়ম-অনাচার দেখলে প্রতিবাদ করেছি। খর ও ক্ষুরধারভাবে সেই ১৯৬৯ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর থেকে অদ্যাবধি লিখে চলেছি। ‘যারা অন্যায়ভাবে কেড়ে খায় মানুষের মুখের গ্রাস’ সেইসব প্রভাবশালীদের হুমকির মুখে বহুবার ছি, ছি, কুড়িয়েছি। তবুও কেন যেন কাউকে পটাতে ইচ্ছা করেনি, যা স্পষ্ট গা জ্বালা করা, সেইসব কথা লেখার পর অনেকেই চটেছেন। নিজেও এই লেখার জগৎ ছাড়তে পারিনি। প্রতিজ্ঞা : ‘যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ প্রাণপণে সরাবো জঞ্জাল!’
সাংবাদিকতা পেশায় সকল মহলকে খুশি করা যায় না। সমাজের সংসারের অসংগতির কথা অকপটে তুলে ধরা, অবহেলিত মানুষ এবং জনজীবনের কথা লেখা, যারা সমাজে অসহায় মানুষের মুখের গ্রাস অবলীলায় অবাধে কেড়ে খায়, তাদের কথা লেখা। মোদ্দা কথা, জালেমের জুলুম, সমাজের দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীর বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে কথা বলা, সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য।
এই সাংবাদিকতা বিষয়ে কোনো তেল তোষামদি নেই। এখানে কাউকে পটানোর অবকাশ নেই। বরং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় কোন না কোন মহল চটে যাবে, উত্তেজিত হবে এটাই স্বাভাবিক।
আজকে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ছোট্ট একটি কাহিনি বলি। আমার জন্ম জনপদ ডুমুরিয়া উপজেলার হৃৎপিণ্ডের উপরের কাহিনি। উপজেলা সদরে উন্মুক্ত খোলা জমিনে গৃহস্থের গবাদি পশুর দুধ বিক্রি হয়। নাম : ডুমুরিয়ার দুধ বাজার। ফুটপাতে উন্মুক্ত খোলা চত্বর। মাথার উপরে কোনো ছাউনি নেই। শতাধিক মানুষ প্রতিদিন তাদের দুধ বিক্রি করে এখানে বসে। একেবারে খোলা জমিনে। এই দুধ বাজারে বছরের ৩৬৫ দিন প্রখর রৌদ্র, মেঘ বৃষ্টি সবকিছু উপেক্ষা করে প্রতিদিন তারা দুধ বিক্রি করে। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট স্থাপনা নেই। যেখানে ক্রেতা বিক্রেতা দু’দণ্ড দাঁড়াতে পারে।
ডুমুরিয়া উপজেলা সদরের এই দুধ বাজার থেকে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা খাজনা বা ইযারা আদায় করা হয়। স্বেচ্ছাচার মূলকভাবে মনগড়া কায়দায় এই ইজারা আদায় হয়। কার কাছ থেকে কতটুকু দুধের জন্য কত টাকা নেওয়া হলো তার কোনো স্লিপ বা রশিদ দেওয়া হয় না। মনগড়াভাবে ইজারা বা খাজনা আদায় করা হয়। বলাবাহুল্য, বিনা ব্যয়ের একটি চমৎকার টাকা আদায়ের জায়গা! নাম ডুমুরিয়া দুধ বাজার। পালপাড়া সড়কের উত্তরে শেষ মাথায়, উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় এসব কীর্তিকলাপ হয়। দুগ্ধ উৎপাদনে শ্রেষ্ঠ এলাকা এই ডুমুরিয়ায় প্রায় ৫০-৫৫ বছর ধরে উলঙ্গ রাজপথে দুধ বাজার বসে। এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়ার কী যেন কেউ নেই?
ডুমুরিয়ায় দুগ্ধ উৎপাদনকারী গৃহস্থ এবং গোয়ালারা প্রতিবছর ১৫ হাত চওড়া এবং বিশ হাত লম্বা ফুটপাতের এই জায়গাটুকুতে বসে প্রায় ১৫- ২০ লাখ টাকা সারা বছর খাজনা দেয়। অথচ ওদের জন্য রোদ বৃষ্টিতে কোনো স্থাপনা নেই। কি বিচিত্র তাই না! টাকা আদায় করা হয় অথচ ওদের ন্যায্য অধিকার থেকে ওরা বঞ্চিত! না উপজেলা প্রশাসন, না সদর ১১ নম্বর ইউনিয়ন পরিষদ, না সামাজিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—কেউ ই এই দুধ বাজার সম্পর্কে গত ৫০ বছরে কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসনের মূল চাবিকাঠি হাতে রয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের, এবং তার সহযোগী সহকারী কমিশনার (ভূমি)’র উপর। কিন্তু দুঃখজনক অপ্রিয় সত্য কথা, ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকার আমলে প্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী থানা টি সাইনবোর্ড পাল্টে মানোন্নীত থানা নামকরণ হয় এবং পরে মডেল উপজেলা বা আদর্শ উপজেলা নামে পরিচিতি পেলেও এই বাজারটি নিয়ে সাধারণ মানুষের সুযোগ সুবিধা অবস্থার অদ্যাবধি ন্যূনতম কোনো পরিবর্তন হয়নি।
যারা এই দুধ বাজারে সকালে জড়ো হয়ে দুধ বেঁচা-কেনা করেন, রাজস্ব উপার্জন হয় সরকারের, অথচ ওদের জন্য একটি স্থায়ী স্থাপনা তৈরি করে দেয়ার ব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা প্রশাসন, কিংবা জন প্রতিনিধিদের কী কোনো দায়িত্বের আওতায় পড়ে না?
যে কথা বলছিলাম, ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এ বিষয়টি জানেন কিনা জানি না, এখানে এই দুধ বাজারে যে খাজনা বা ইজারা আদায় করা হয়, তা কত কেজি দুধে কত ধার্য করা হয়, তার কোনো রশিদ বা স্লিপ দেওয়া হয় না। আমার এ লেখা যদি খুলনা জেলা প্রশাসক মহোদয় পড়েন তাহলে দাবি করবো ডুমুরিয়া দুধ বাজারে আর কাল বিলম্ব না করে এক/দুই মাসের মধ্যে একটি স্থায়ী শেড নির্মাণ করে এই হতভাগা জনগণকে একটি স্বস্তির পরিবেশ ফেরত দেবেন। স্বাধীন দেশে এমন অমানবিক দৃষ্টিকটু রাস্তার ফুটপাতের উপর তথাকথিত দুধ বাজার চলছে, যুগের পর যুগ ধরে। যেখানে প্রতিদিন নিয়মিত কমপক্ষে ৫০০০ টাকা ইজারাদাররা অবাধে আদায় করে। প্রতি মাসে ৩০ দিনে কত আদায় হয়? তাহলে ৩৬৫ দিনে কত আদায় হয়? তারা কি একটি স্থায়ী স্থাপনার নিচে বসে স্বস্তিতে তাদের উৎপাদিত দুধ বেচাকেনার অধিকার টুকু দাবি করতে পারে না?
এ ব্যাপারে হইচই করার কোনো কারণ নেই। দুধ বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে ইজারাদারদের হাতে রশিদ বই থাকতে হবে। দুই-এক কেজি দুধ নিয়ে আসে যে গৃহস্থ, তার কাছ থেকে আদায়কারী কত টাকা নিচ্ছে! আবার ১০-১২ কেজি যে গৃহস্থ আনে তার কাছ থেকে কত টাকা খাজনা নিচ্ছে বৃহত্তর জনস্বার্থে এটি অবশ্যই ওয়াকেফহাল মহলের জানা দরকার।
বলা বাহুল্য, ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসন আইন রক্ষার জন্য অতি আগ্রহে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেন, তা তো জনমহলে বেশ প্রশংসা অর্জন করেছে। এ ব্যাপারে অনেকেই করতালিতে মুখরিত করে উপজেলা প্রশাসনকে ধন্যবাদ দেন নানা ভঙ্গিতে অজস্রভাবে। কিন্তু ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসনের উদ্দেশ্যে বলবো, আল্লাহর ওয়াস্তে, ডুমুরিয়া সদরের এই দুধ বাজারে ইজারার নামে দুধ উৎপাদনকারী প্রান্তিক গৃহস্থদের কাছ থেকে কত টাকা কীভাবে আদায় করা হয় একটু মনিটরিং করুন। তাহলে থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়বে।
এদেশে ব্রিটিশ আমলে জমি মালিক কৃষকের তেভাগা ব্যবস্থা ছিল, নীলকর দস্যুদের জুলুম ছিল, কুঠিতে নিয়ে কৃষকদের শারীরিক-মানসিক জুলুম করা হতো, তাও সব বন্ধ হয়েছে, প্রায় ১০০ বছর। কিন্তু ডুমুরিয়ার মতো খুলনা জেলার একটি বৃহৎ উপজেলা সদরের দুধ বাজারের দৈনন্দিন চিত্রটি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয় মাসে ২-৩ বার মনিটরিং করলে, এর ভেতরে নিষ্করুণ একটি চাপা জুলুমের চিত্র বেরিয়ে আসবে। আশা করবো, দরিদ্র মানুষ যারা এক/ দুই কেজি দুধ বাজারে আনে অথবা যারা অঢেল দুধ বিক্রি করে তাদের ইজারা কেজি প্রতি কত নেওয়া হবে, উপজেলা প্রশাসন ইচ্ছা করলে, কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্তে নির্ধারণ করে দিতে পারবে। অনেক কাজের ভিড়ে সদাশয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয়ের চোখে এ লেখা পড়বে কিনা জানি না। তবে পাবলিক বিশেষ করে তথাকথিত ফুটপাত বাজার যা দুধ বাজার বলে পরিচিত ওদের খাজনা নির্ধারণ, ওদের সুন্দর ভাবে বেচাকেনার জন্য একটি শেড নির্মাণ করে দেওয়া, উপজেলা প্রশাসনের কাছে সময়ের দাবি।
যে সব জনপ্রতিনিধি অর্থাৎ নেতারা ডুমুরিয়া উপজেলার বহু সমস্যা নিয়ে নিরন্তর মাথা ঘামাচ্ছেন, তাদের ক্ষণকালের জন্য এই ব্যাপারটি নিয়ে একটু ভেবে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এই হতভাগ্যদের দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ এই অর্ধ শতাব্দীর বিড়ম্বনার স্থায়ী অবসান ঘটানো যায় কিনা ভেবে দেখবেন।
স্মরণযোগ্য, ডুমুরিয়া উপজেলা পরিষদে প্রতিমাসে পরিবেশ উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়, সেখানে এই অভাজনের আবদারটুকু আপনার চা বিরতি গ্রহণের সাইড লাইনে ইউএনও মহোদয়ের কাছে, ডুমুরিয়া দুধ বাজারের বিড়ম্বনার কথাটি, ভেবে দেখবেন তুলে ধরা যায় কিনা। আশা করি ডুমুরিয়ার সর্বস্তরের গণমানুষের এ ব্যাপারে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আপনাদের অভিমত জানাবেন। বিষয়টি আর যাতে তামাদি না হয়, সেজন্য ডুমুরিয়া উপজেলা প্রশাসনের প্রসন্ন দৃষ্টি কামনা করছি।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

