চা বিক্রেতা পেয়ারা বেগমের জীবন-সংগ্রাম

বাসা বাড়িতে ভালো-মন্দ রান্না হলেও কাজের লোকদের খেতে দেয় না, তাই স্বাধীন ব্যবসা

আয়শা আক্তার জ্যোতি

লোকের বাসায় কাজ করতে গেলে অনেকেই দূর-দূর করে তাড়িয়ে দেয়। আবার যে বাসায় কাজ পাই, সেখানে ভালো-মন্দ রান্না হলেও কাজের লোকদের খেতে দেয় না। তারা ঘরে বসে খায় আর আমাকে রান্নাঘরে খেতে দেয়। এসব আমি আর সহ্য করতে পারি না। তাই চা বিক্রি করি। আমি স্বাধীনভাবে থাকতে চাই। এভাবে মনে কষ্ট নিয়ে কথাগুলি বলছিলেন চা বিক্রেতা পেয়ারা বেগম।

একমাত্র সন্তানের আয়ে ভালোভাবে সংসার চলে না। অনেকটা নূন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো। সংসারের এই দুরবস্থায় বসে থাকতে পারেনি ষাটোর্ধ্ব মা পেয়ারা বেগম। স্বামীর মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া টং দোকানে চা বিক্রি শুরু করেন। এর আগে প্রায় ৩০-৩৫ বছর ধরে শহরের বিভিন্ন জায়গায় স্বামীর সঙ্গে চা বিক্রি করতেন তিনি।

দেড় বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ায় পাঁচ সদস্যের পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে তার রেখে যাওয়া টং দোকানেই চা বিক্রি করছেন তিনি। পেয়ারা বেগমের একমাত্র ছেলে ১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করেন। ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি নিয়েই তার সংসার। ঘর ভাড়া গুনতে হয় মাসে সাত হাজার টাকা। এই ব্যয় সামলাতে পেয়ারা বেগম নগরীর শেখপাড়া তেঁতুলতলা মোড়ে গ্যারেজ সামনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরামহীনভাবে দাঁড়িয়ে চা বিক্রি করেন। পরিবারের কথা ভেবে হাজারো কষ্ট তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করেন।

পেয়ারা বেগম বলেন, ওর বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই এই গ্যারেজের সামনে চা, বিস্কুট ও সিগারেট বিক্রি করি। এখানে যারা কাজ করে এবং গাড়ি ঠিক করাতে আসে এমনকি আশপাশের দোকানের লোকজন কমবেশি সবাই চা পান করতে আসে।

দিনে দোকান প্রায় ১৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। আমি ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা থাকি, বাকি সময় আমার ছেলে দোকানে বসে। প্রতিদিন একরকম আয় হয় না। তবে দিনে ১০০, ২০০ কিংবা ৩০০ টাকা লাভ থাকে। আমার ইচ্ছে, এই দোকান করে সংসার চালানোর পাশাপাশি মাথা গোঁজার জন্য একটা ঘর তৈরি করা।

তিনি বলেন, সারাদিন দাঁড়িয়ে কাজ করি। শরীর খারাপ থাকলে মনে হয় আর দোকান চালাব না। আবার লোকের বাসায়ও কাজ করতে পারিনা। বাসায় বসে থাকলে খাব কী? ছেলের আয়ে সংসার ভালোভাবে চলে না। আর সারাদিন বাসায় বসেও থাকতে পারি না। তাই পরের দিন সকালে আবার দোকানে চলে আসি। এভাবেই দিন কেটে যায়।

দুপুরে দোকানে খাবার দিতে আসা পেয়ারা বেগমের ছেলের বউ বলেন, বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছি, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি একসঙ্গে এই দোকান চালাতেন। কিন্তু শ্বশুর মারা যাওয়ার পর থেকে মা একা হাতে দোকান চালাচ্ছেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মা দোকানে থাকেন। এরপর ওর আব্বু এসে রাত পর্যন্ত দোকানে থাকে। শ্বশুর মারা যাওয়ার পর আমাদের পরিবার চালানোর জন্য একমাত্র ভরসা ছিল ওর আব্বুর চাকরি। কিন্তু তার বেতনে সংসার চলত না। ঘরভাড়া, ছেলেমেয়ের স্কুলের খরচ চালাতে কষ্ট হতো। এই দোকান চালিয়ে মা সংসারের বাজার-সদাই করেন। এখন অনেকটা সুন্দরভাবে সংসার চলে। শুক্রবার দোকান বন্ধ থাকলে বাসায় মায়ের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। দোকানে থাকলেই যেন তিনি ভালো থাকেন।

ওই দোকানে চা খেতে আসা ক্রেতা ফারুক বলেন, আমি এখানে দুই-তিন বছর ধরে চা খেতে আসি। এখানে বসি, চা খাই, আড্ডা দিই। তার আর্থিক অবস্থা খারাপ বলেই আজ তিনি এই বয়সে চা বিক্রি করছেন। যা দেখে আমাদের ভালো লাগে। কাকির চা যেমন ভালো, তেমনি ভালো তার ব্যবহার। তাই এখানে এসে কাকির হাতের চা খেতে আমাদের খুব ভালো লাগে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন