বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচীতে পুলিশ-শিক্ষার্থীদের মধ্যে নগরীর কয়েকটি এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুপুর ২টা থেকে দফায় দফায় এ সংঘর্ষ চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। এ সময় স্থানীয় ময়লাপোতা মোড়, সাতরাস্তা মোড়, মডার্ন মোড় ও পিটিআই মোড় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশশিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষসহ অন্তত এক’শ জনকে আটক করে।
সংঘর্ষ চলাকালে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। এ সব এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করে। পথচারীরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়।
পুলিশ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিলে ছাত্রদের একটি অংশ ময়লাপোতা মোড়ের আহসানউল্লাহ কলেজে আশ্রয় নেয়। তারা ভবনের ভেতর প্রবেশ করে তালা ঝুলিয়ে দেয়। পুলিশ গিয়ে তালা ভেঙে ৩৫ জনকে আটক করে (যুগান্তর ৩১ জুলাই ২০২৪)। দুপুর দেড়টার পর ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী ডালমিল মোড় থেকে লাঠি নিয়ে মিছিল বের করে। পুলিশ আন্দোলনকারী ভেবে তাদের ধাওয়া দিলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে শের-এ-বাংলা রোড থেকে ছাত্রলীগের আরেকটি মিছিল ময়লাপোতা হয়ে সাত রাস্তার দিকে চলে যায়। ময়লাপোতা মোড়ে পুলিশের লাঠিচার্জে টিকতে না পেরে দুপুর সোয়া ২টার দিকে দুই-আড়াইশর মত শিক্ষার্থী ফের জড় হয় নগরীর সাতরাস্তার মোড়ে। সেখানে তারা দুদিকের রাস্তা আটকে বিক্ষোভ-সমাবেশ করতে শুরু করে। এ সময় চারপাশ দিয়ে পুলিশ শিক্ষার্থীদের ঘিরে ফেলে। পুলিশ হ্যান্ডমাইকে বারবার শিক্ষার্থীদের চলে যেতে বলে।
সেখান থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে আন্দোলনকারী ছাত্ররা দুপুর ৩টার দিকে নগরীর মডার্ণ ফার্ণিচার মোড়ে গিয়ে রাস্তা আটকে বিক্ষোভ করতে থাকে। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ও শটগান দিয়ে ফাঁকা গুলি ছোড়ে। সেখানেও শিক্ষার্থীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে। পুলিশ ছাত্রদের ধাওয়া দিলে তারা নগরীরপিটিআই মোড়ে অবস্থান নেয়। সেখানেও কয়েক দফা সংঘর্ষ হয় পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ছাত্ররা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়। বেলা দেড়টার পর ছাত্রলীগের কর্মীরা ডালমিল মোড় থেকে লাঠি মিছিল বের করে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। শের-এ-বাংলা রোড় থেকে আরও একটি মিছিল ময়লাপোতার দিকে রওনা হয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের সমন্বয়ক জহুরুল ইসলাম তানভীর বলেন, ‘আমরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করেছি। তবে খুলনাতে আমরা কোনো সহিংসতা করিনি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থীদের দিয়ে জোরপূর্বক যে প্রেস ব্রিফিং করানো হয়েছে, তা নোংরা রাজনীতির অংশ ছাড়া কিছুই নয়। এ অবস্থায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা এই বিবৃতি প্রত্যাখান করছি।
খুলনা সার্কিট হাউসে বৈঠক শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দেলনের স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে নগরীর বিভিন্ন থানা থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের ফোন করে রাত ৯টায় খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের-কেএমপি সদর দপ্তরে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। পরবর্তীতে সময় ও স্থান পরিবর্তন করে রাত ১০টায় সার্কিট হাউজে নির্ধারণ করা হয়।
সভায় খুলনা সিটি কর্পোরেশন-এর সাবেক মেয়র ও খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক, সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন, যুবলীগের নগর সভাপতি শফিকুর রহমান পলাশ, সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহজালাল সুজন, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার সরদার রকিবুল ইসলাম, খুবির ছাত্র বিষয়ক সহকারী পরিচালক রাজু রায়, রাকিবুল ইসলাম টুটুল, খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে খুবির পরিসংখ্যান ডিসিপ্লিনের ছাত্র জহুরুল ইসলাম তানভীর, ইংরেজী ডিসিপ্লিনের আয়মান আহাদ, বাংলা ডিসিপ্লিনের নাঈম মল্লিক, অর্থনীতি ডিসিপ্লিনের মুহিব্বুল্লাহ, নগর ও গ্রামীন পরিকল্পনা ডিসিপ্লিনের কাজী ফাহাদুল ইসলাম, ভাস্কর্য ডিসিপ্লিনের আজিম ইসলাম জীম, আবরাব জাহিন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা ডিসিপ্লিনের বিপুল শাহরিয়ার, হিউম্যান ডিসিপ্লিনের মিনহাজুল আবেদীন সম্পদ, আইন ডিসিপ্লিনের মোঃ আল শাহরিয়ার, হেলাল, একসময়ের ছাত্রলীগ কর্মি সাজ্জাদুল ইসলাম আজাদ, সরকারি আযম খান কমার্স কলেজের শেখ রাফসান জানি ও নর্থ ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইমন হাওলাদার, অভিভাবক এ্যাড. শেখ রফিকুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নিরপরাধ শিক্ষার্থীদের হয়রানি না করতে আহ্বান জানায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ থেকে প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
খুলনায় পুলিশের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনায় দু’টি মামলা হয়েছে। ৩১ জুলাই রাতে পুলিশ বাদী হয়ে খুলনা সদর ও সোনাডাঙ্গা থানায় মামলা হয় দু’টি দায়ের করে। পুলিশের দায়ের করা প্রতিটি মামলায় ২’শ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ১১ জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
সদর থানার মামলার বাদী হয়েছেন এস আই হাসানুর রহমান। মামলায় ছয় জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত পরিচয় ৩’শ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলায় আগের দিন আটক ছয় শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার কারাগারে পাঠানো হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচী পালনের লক্ষে ৩১ জুলাই সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সড়কে জড় হতে শুরু করেন। তারা নগরীর রয়্যাল মোড়, সাত রাস্তা মোড়, ময়লাপোতা মোড়ে অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন ধরনের শ্লোগান দেন। এ সময় খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ ও শিক্ষার্থীরা একে অপরকে ধাওয়া করে। এখানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেখান থেকে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে।
পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা রয়্যাল মোড় এলাকায় এলে পুলিশ তাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে রাখে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সাত রাস্তার মোড়ে থাকা পুলিশের দুটি গাড়ি পিছু হটলেও দুপুর সোয়া ২টার দিকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষ শুরুর পর পুলিশ ব্যাপক কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এদিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত নগরীর ময়লাপোতা মোড়, শেরে বাংলা রোড, সাতরাস্তা মোড়, শান্তিধাম মোড়, দোলখোলা মোড়, রয়েল মোড়, মডার্ণ ফার্ণিচার মোড়, মৌলভীপাড়া মোড় ও টুটপাড়া মোড়ে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। ৩১ জুলাই নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে ৯০ থেকে ৯৫ জন আন্দোলনকারীকে আটক হয়। যাচাই-বাছাই শেষে রাতে শিক্ষার্থীদের তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকদের জিম্মায় মুক্তি দেওয়া হয়। ১১ জনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ১ আগস্ট সকালে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
খুুলনা গেজেট/এনএম

