একজন রতন সেন : আদর্শের জন্য ছিলেন আপোষহীন

গৌরাঙ্গ নন্দী

মার্কসবাদী আদর্শের সৈনিক হিসেবে তিনি জীবন শুরু করেছিলেন। জীবন দিয়েছেনও সেই আদর্শের পতাকা সমুন্নত রেখে। অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন, তবে তাঁর ত্যাগী জীবনাদর্শ সম্পর্কে কেউ ভিন্নমত পোষণ করেন না। তিনি নিজের জন্যে কিছুই চাননি, কিছুই করেননি, জীবন-যাপন করেছেন একেবারে অনাড়ম্বরভাবে, মানুষের কাছে শতভাগ দায়বদ্ধ ছিলেন। অর্থনৈতিক-সামাজিক শোষণ থেকে মানুষ কীভাবে মুক্তি পেতে পারে সেটাই ছিল তাঁর একমাত্র ভাবনা। তবুও স্বার্থান্বেষী মানুষের প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাঁকে ছুরিকাঘাতে মৃত্যুবরণ করতে হয়। সেই কালো দিনটি ১৯৯২ সালের ৩১ জুলাই।

বলা যায়, খুলনার রাজনৈতিক নেতা হত্যাকাণ্ডের সেই শুরু। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছিল। পুলিশ যথারীতি তদন্ত করে চার্জশিট দিয়েছিল। বিচারও হয়েছিল। কিন্তু কেউ সাজা পায়নি। কারণ, অপরাধী চিহ্নিত-প্রমাণিত হয়নি। এ থেকে অনেকের মনেই প্রশ্ন যে, তবে কি রতন সেন খুন হয়নি, না-কি এই সমাজ তাঁর হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে চায় না?

আধুনিক সমাজে রাষ্ট্রের অন্যতম অঙ্গীকার হচ্ছে, রাষ্ট্র নাগরিককে নিরাপত্তা দেবে। কোনো অপরাধ ঘটলে রাষ্ট্র সেই অপরাধজনক ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে অপরাধীকে চিহ্নিত করে, বিচারে সোপর্দ করে সাজা দেবে। এ কারণে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ -আইন বিভাগ, শাসন বা নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ প্রভৃতি স্বতন্ত্র-স্বাধীন। কিন্তু রতন সেন হত্যারহস্য উন্মোচিত হয়নি। অবশ্য, রতন সেন এই রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরোধিতা করতেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে রাষ্ট্রকে শ্রেণি শোষণের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো, রাষ্ট্রকে সমাজের দুর্বলতম গোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হতো।

যেহেতু রতন সেন সমাজের দুর্বলতম অংশ-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন; আন্তরিকভাবে চাইতেন সমাজের পিছিয়ে থাকা শ্রমিক-কৃষক-দিনমজুর-অন্ত্যজ প্রভৃতিরা সকল প্রকার রাজনৈতিক-সামাজিক-আর্থনীতিক শোষণ থেকে মুক্তি পাক, ব্যক্তির আশা-আকাক্সক্ষা সামাজিক দায়বোধের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাক, এ কারণে তিনি নিজেকেও এক ও অনন্য হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি অতি সাধারণ পোষাক-পরিচ্ছদ পরতেন, অতি সাধারণ খাবার খেতেন, বসবাস করেছেনও অতি সাধারণভাবে। বেশিরভাগ সময় শুভানুধ্যায়ীদের দেওয়া খাবার খেতেন। ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবন তাঁর ছিল না। বিয়ে করেননি। মোটা সুতীর পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেন। নিজেই কাপড় পরিষ্কার করতেন। আক্ষরিকভাবে যে রাজনৈতিক আদর্শের চর্চা করেছেন, সর্বাঙ্গীনভাবে তাঁর জীবনযাপন পদ্ধতিতে সেই আদর্শিক প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছেন।

রতন সেনের পারিবারিক নাম ছিল সুনীল সেনগুপ্ত। বরিশালের এক মোটামুটি সচ্ছল পরিবারে তিনি জন্মেছিলেন ১৯২৩ সালের ৩ এপ্রিল। পিতা নরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজে পিতার চাকুরির সুবাদে তিনি এখানে আসেন। ১৯৩৮ সালে দৌলতপুর মহসিন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৪২ সালে বিএল কলেজ থেকে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করেন। স্কুলের ছাত্রাবস্থায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুরু। সেই থেকে রাজনীতিই ছিল তাঁর একমাত্র কাজ। পারিবারিক সদস্য-ব্যক্তি সুনীল সেনগুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমেই রতন সেন হয়ে সমাজের কাছে দায়বদ্ধ এক ব্যক্তিরূপ হিসেবে আবির্ভূত হন।

১৯৪৭ পরবর্তীকালের এই বাংলা ছেড়ে তাঁর পরিবারের অপরাপর সদস্যরা ভারতে চলে গেলেও তিনি এখানেই রয়ে যান। ‘৪৭ থেকে ৭১’ এই ২৪ বছর সময়কালে ১৭ বছর রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন। দলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে বটিয়াঘাটার বয়ারভাঙ্গা স্কুলে ও তেরোখাদা আজগড়া স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। লিখেছেন অসংখ্য রাজনৈতিক-সামাজিক প্রবন্ধ-নিবন্ধ। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে তাঁর রাজনৈতিক দলকে একটি গণভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। খুলনা ছেড়ে অন্যত্র যাওয়ার কথা ভাবেননি। একপর্যায়ে তাঁকে দেশের কেন্দ্র রাজধানী ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হলেও তিনি সেখানে বেশিদিন থাকেননি।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নের শিক্ষা-সংস্কৃতি বিনিময় চুক্তি ছিল। সেই চুক্তির আওতায় খুলনা ও আশেপাশের অঞ্চলের অনেকেই রতন সেনের সুপারিশ নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশোনা করেছেন। এদের মধ্যে অনেকেই খুলনা শহরে আজ প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক। অনেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন।

সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সাথে রতন সেনের ছিল নিবিড় সম্পর্ক। তিনি রূপসার পালের হাটের বাজারের কাছে যে বাড়িটিতে থাকতেন তাঁর আশেপাশের অনেককে তিনি ছোটখাট ব্যবসা করার জন্যে সহযোগিতা করেছেন। অনেককে রিকশা-ভ্যান কিনে দিয়েছেন। যাদেরকে রিকশা-ভ্যান দিয়েছিলেন, তাঁদের সাথে একটিই কথা ছিল, তাঁরা তাঁকে (রতন সেন) নদীর ঘাট থেকে আনা-নেওয়া করবে, আর যারা শহরে রিকশা চালায় তাঁরা প্রয়োজনে তাঁকে (রতন সেন) এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে।

শহরের তেমনি এক পরিচিত রিকশায় তিনি উঠেছিলেন ১৯৯২ সালের ৩১ জুলাই। রিকশাটি ডিসি ও এসপি অফিসের সামনে এলে অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তরা তাঁকে ছুরিকাঘাতে খুন করে। সেদিনও তিনি নিজের হাতে পরিষ্কার করা সুতি মোটা কাপড়ের পাজামা-পাঞ্জাবি পরে নদীর অপড় পাড় থেকে খুলনা শহরে এসেছিলেন। যাচ্ছিলেন বাগেরহাটে এক সাংগঠনিক কাজে। ঘাতকের আঘাতে রাস্তায় রক্ত ঝড়ে এই মানুষটির মৃত্যু হয়। থেমে যায় সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনের এক সৈনিকের জীবন চলা।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও পরিবেশ গবেষক।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন