ক্ষমতা হারানোর দুই বছর পরও ভারতে বিলাসী জীবন কাটাচ্ছেন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা। নামিদামী শপিংমলে তাদের ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুই চাচাতো ভাই শেখ হেলাল ও শেখ জুয়েলের কিছু ছবি সামনে এসেছে। খুলনার দাপুটে এই নেতার সঙ্গে তাদের স্ত্রী, সন্তানদেরও কোলকাতায় দেখা গেছে।
সেই তুলনায় কষ্টে রয়েছেন খুলনা আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা। সীমাহীন লুটপাটের কারণে তাদের বেশিরভাগই এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যারা লুটপাটে অংশ নিতে পারেননি তারাও সামাজিকভাবে অনেকটা একঘরে জীবন কাটাচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেখ হেলাল ও তার ভাই শেখ জুয়েল, ভারতের কলকাতা শহরের নিউ টাউন এলাকায় অবস্থিত দ্যা ভি লাক্সারী এপার্টমেন্ট টাওয়ারের দুটি পৃথক ৪ বেডরুমের এপার্টমেন্টে বসবাস করছেন। শেখ জুয়েলের সাথে তার স্ত্রী শম্পা বসবাস করছেন। তাদের দুই সন্তান প্রায়ই ভারতে ভ্রমণ করে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন। শেখ হেলালের সাথে তার স্ত্রীকে দেখা যায়নি, তবে তার ছেলে শেখ তন্ময়কে কিছুদিন পরপরই পিতার সাথে সাক্ষাৎ করতে দেখা যায়।
খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এস এম কামাল হোসেন, খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি কাজী আমিনুল হক, মহানগর যুবলীগের সভাপতি শফিকুর রহমান পলাশসহ আরও অনেকে বর্তমানে কোলকাতার ফ্লাট ভাড়া করে আয়েশী জীবনযাপন করছেন।
কোলকাতার একটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের থাকছেন কলকাতার অভিজাত রাজারহাট নিউটাউন এলাকায়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও কলকাতা নিউটাউন এলাকায় আয়েশী জীবন যাপন করছেন। আর সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম কলকাতার অভিজাত এলাকা টাটা হাউজিং অ্যাভিনিডাতে বড় আকারের দুটি ফ্ল্যাট নিয়ে থাকছেন।
কলকাতা থেকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের মামলার আসামি এসব পলাতক নেতারা বিদেশে আয়েশীভাবে থাকছেন। কোনো কিছুরই অভাব নেই সেখানে। গাড়ি-বাড়ি, ব্যক্তিগত কর্মী, ব্যক্তিগত চিকিৎসক থেকে শুরু করে নিরাপত্তারক্ষী নিয়ে থাকছেন তারা। তাদের অনেকেরই ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্য আর সম্পদ আছে। তাই ফেরারি থেকেও অর্থসম্পদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
জানা গেছে, উত্তর কলকাতার ভীষণ নিরিবিলি এলাকা রাজারহাট নিউটাউন। এখানকার ‘ডিএলএফ নিউটাউন হাইটস প্লাজা’য় থাকেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উত্তর কলকাতার ভীষণ নিরিবিলি এলাকা রাজারহাট নিউটাউন। এটি মূলত হাইরাইজ কমপ্লেক্স, যেখানে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা আছে।
কলকাতায় বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, ভারতের সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে ‘ওয়াকিবহাল’। তাই কোনো অপরাধ না করলে তাঁদের ‘হয়রানি’ করা হয় না।
নিউটাউন হাইটস প্লাজায় আরও থাকেন টাঙ্গাইল-২ আসনের আলোচিত সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর হাসান ওরফে ছোট মনির। ছোট মনির সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী ও শ্রমিকনেতা শাজাহান খানের জামাতা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা কলকাতা থেকে জানিয়েছেন, দলের সাধারণ সম্পাদক বাসা থেকে খুব একটা বের হন না। তবে মাঝেমধ্যে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যান। ওবায়দুল কাদের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দেখাও করেন না।
কলকাতার নিউটাউন আবাসিক এলাকার আরেক অভিজাত কমপ্লেক্স ‘রোজডেল গার্ডেন’। এই কমপ্লেক্সের ৩ নম্বর অ্যাকশন এরিয়ার ২ নম্বর টাওয়ারের ১১ তলার ১১-সি ফ্ল্যাটে থাকেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। নিউটাউনের এই ফ্ল্যাটে স্ত্রী, মেয়ে ও জামাতাকে নিয়ে থাকেন শেখ হাসিনার অন্যতম আস্থাভাজন সাবেক এই মন্ত্রী।
কলকাতায় পুরোদস্তুর সংসার পেতে বসেছেন ফেনী-১ আসনের আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম। তিনি স্ত্রী, ভাইবোন ও পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যকে নিয়ে নিউটাউনের অভিজাত এলাকা টাটা হাউজিং অ্যাভিনিডাতে থাকেন। সেখানে তাঁরা বিশাল আকারের দুটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক পূর্ব কলকাতার সল্টলেকের একটি অত্যাধুনিক কমপ্লেক্সের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আর অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ওই কমপ্লেক্সে অনেক নামীদামি লোকজনও থাকেন। সাবেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী নানকের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও জামাতা থাকেন।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম স্ত্রীকে নিয়ে থাকছেন কলকাতার আরেক আবাসিক এলাকা তপসিয়ায়।
খুলনা গেজেট/এনএম

