২০ বছর পরিত্যক্ত মরক্কোর সেই মসজিদ এখন দশনার্থীদের প্রধান আকর্ষণ

গেজেট প্রতিবেদন

মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অবস্থিত আস-সুন্নাহ মসজিদ আয়তনের দিক থেকে দেশটির চতুর্থ বৃহত্তম এবং স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। অষ্টাদশ শতাব্দীর আলাউই রাজবংশের আমলে নির্মিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ এক সময় দীর্ঘ ২০ বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। এমনকি এর ছাদ পর্যন্ত সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল অন্য শহরে। তবে পরবর্তীতে পুনঃসংস্কার এবং এর মিনারের অবস্থান পরিবর্তনের পর মসজিদটি এখন রাবাতের অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান ও ইসলামী ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে

রাবাতের প্রধানতম সড়ক মোহাম্মদ ফাইভ এভিনিউ (যেখানে দেশটির সংসদ ভবন অবস্থিত) এবং হাসান ফার্স্ট এভিনিউয়ের সংযোগস্থলে এই মসজিদের অবস্থান। মসজিদের ঠিক পাশেই রয়েছে রাজপ্রাসাদ এবং ঐতিহ্যবাহী তুয়ারগা প্রাচীর।

এর পেছনের অংশে রয়েছে সরকারি প্রশাসনিক এলাকা, যেখানে জাতীয় বেতার কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান অবস্থিত। কাছাকাছি দূরত্বে রয়েছে সমসাময়িক শিল্পকলা জাদুঘর এবং প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থানের কারণে আজান হওয়া মাত্রই চারপাশ থেকে মুসল্লিদের ঢল নামে এখানে।

এই মসজিদের নিয়মিত মুসল্লিদের বড় অংশ সরকারি কর্মকর্তা ও চাকরিজীবী। কর্মদিবসের ব্যস্ততার মাঝেও জুমার দিনে তাদের অনেককে ঐতিহ্যবাহী মরক্কো পোশাক ‘জেল্লাবা’ এবং বিশেষ জুতো ‘বালঘা’ পরে নামাজে আসতে দেখা যায়। মোট ৫ হাজার ৫৬৫ বর্গমিটার আয়তনের এই মসজিদে রয়েছে ৬টি প্রবেশদ্বার।

স্থাপত্যের নান্দনিক মেলবন্ধন

বাহির থেকে মসজিদটির প্রবেশদ্বারের কারুকার্যখচিত তামাটে অবয়ব এবং ছাদের সবুজ টালির নকশা যে কারও নজর কাড়ে। এর চারকোনা মিনারটির প্রতিটি পাশ দেখতে হুবহু এক। ইতিহাস গবেষক হিশাম লাহরাশ জানান, এই মিনারের নকশা মূলত পবিত্র কাবার চতুষ্কোণ আকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত, যা চারদিক বা চার দিকনির্দেশকে (উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম) নির্দেশ করে। দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ কিংবা সেভিলের বিখ্যাত মিনারের স্থাপত্যের সঙ্গে এর মিল রয়েছে। মিনারের একদম ওপরে রয়েছে তিনটি গোলাকার বল, যা যথাক্রমে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদকে প্রতীকায়িত করে।

মসজিদের ভেতরে ঢোকার মুখে রয়েছে নামাজঘরের সমান্তরাল একটি বিশাল বারান্দা, যা এক সময় জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নামাজঘরের মূল ফটকে পৌঁছানোর আগে চোখে পড়বে মার্বেল পাথরের তৈরি দুটি নান্দনিক ফোয়ারা। ভেতরের ছাদ থেকে ঝুলছে বিশাল সব ঝাড়বাতি। পুরো ছাদটি জ্যামিতিক কাঠের কাঠামো দিয়ে তৈরি, যা ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলীর কথা মনে করিয়ে দেয়। গবেষকদের মতে, এই মসজিদে উমাইয়া, মুওয়াহিদ ও আলাউই— এই তিন যুগের স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।

সুলতানি আমলের ইতিহাস

অবসর নেওয়ার পর দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই মসজিদের দেখভাল ও কোরআন শরীফ গোছানোর দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন হাজি আলী। তিনি জানান, এই মসজিদকে রাজাদের মসজিদ বলা চলে। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, এই মসজিদের চারপাশের বিশাল চত্বরটি একসময় ঘন বাগান আর গাছে ঘেরা ছিল, সেখান দিয়ে পানির নালা বয়ে যেত।

হিজরি ১১৯৯ সালের জমাদিউল আউয়াল মাসে (মার্চ ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দ) আলাউই বংশের সুলতান মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তৎকালীন সময়ে তিনি এই মসজিদ নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন। সুলতান মোহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ রাবাতে তার রাজপ্রাসাদ নির্মাণের পর সুলতানের নিজস্ব জামে মসজিদ হিসেবে তৈরি করেন এই মসজিদ। এই মসজিদে তিনি উসমানীয় সুলতান প্রথম আব্দুল হামিদের দূত ইসমাইল এফেন্দীকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

তবে সুলতানের মৃত্যুর পর এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দীর্ঘ ২০ বছর ধরে জনমানবহীন ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। শহর থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায় এখানে মানুষের আনাগোনা ছিল না। এই সুযোগে পরবর্তী সুলতান মৌলে সুলেমান এই মসজিদের ছাদের মূল্যবান কাঠগুলো খুলে নিয়ে মারাকেশের আলী বিন ইউসুফ মসজিদের ছাদ নির্মাণে ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে সুলতান মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান এই মসজিদের ব্যাপক সংস্কার করেন এবং এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত ও জুমা নামাজ চালু করেন। ১৯০৭ সালে সুলতান আবদুল আজিজও এই মসজিদের মেহরাবের পেছনের অংশে কিছু সম্প্রসারণ কাজ করেছিলেন।

মসজিদের সংস্কার

মসজিদটির আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৬৯ সালে। তৎকালীন মরক্কোর রাজা দ্বিতীয় হাসান মসজিদটি সম্পূর্ণ নতুনভাবে সংস্কারের নির্দেশ দেন। এই সংস্কার কাজের অংশ হিসেবে মসজিদের মিনারটিকে উত্তর প্রান্ত থেকে সরিয়ে দক্ষিণ প্রান্তে পুনর্নির্মাণ করা হয়। এর ফলে মিনারটি এখন রাজধানীর সবচেয়ে বড় রাস্তা মোহাম্মদ ফাইভ এভিনিউয়ের একদম সোজাসুজি কেন্দ্রবিন্দুতে দৃশ্যমান হয়, যা শহরের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাচীন মুওয়াহিদ রাজবংশের জ্যামিতিক স্থাপত্যের মূল ধারাকে ফিরিয়ে আনা হয়।

সৌন্দর্য ও জ্ঞানের আধার

আস-সুন্নাহ মসজিদটি একই সঙ্গে যেমন বিশাল ও জমকালো, ঠিক তেমনি এর ভেতরের পরিবেশ শান্ত ও পরিচ্ছন্ন। নান্দনিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই মসজিদ মরক্কোর ইসলামী শিক্ষার অন্যতম বড় কেন্দ্র। দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত আলেমরা এখানে নিয়মিত ধর্মীয় আলোচনা ও কিতাবের পাঠ দিয়ে থাকেন। প্রতি বছর পবিত্র রমজান মাসে মরক্কোর রাজপরিবারের সদস্যরা এই মসজিদে সমবেত হয়ে মরক্কোর আধুনিক স্থপতি রাজা পঞ্চম মোহাম্মদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন।

খুলনা গেজেট/রুএ




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন