শুরু হয়েছে হিজরি নববর্ষ ১৪৪৮। হিজরি সন মুসলিমদের নিজস্ব বর্ষপঞ্জি, যার সূচনা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ১৭ হিজরি সালে হজরত ওমর (রাঃ) প্রশাসনিক প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে হিজরি সনের প্রচলন করেন এবং হিজরতকে এর সূচনাবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
হিজরতের মাধ্যমে ইসলাম নতুন শক্তি ও গতি লাভ করে। মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইসলামের প্রসার বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তাই হিজরি সন শুধু একটি তারিখ গণনার পদ্ধতি নয়, বরং ইসলামের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের স্মারক।
মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম। রমজান, ঈদ, হজ, জাকাত, ইদ্দতসহ বিভিন্ন ধর্মীয় বিধান ও ইবাদত হিজরি তারিখ অনুসারেই পালন করা হয়। হিজরি বছরের প্রথম মাস মুহাররম, যা ইসলামি নববর্ষের সূচনা নির্দেশ করে।
হিজরি নববর্ষ আমাদের জন্য হিজরতের ত্যাগ, ধৈর্য ও সংগ্রামের শিক্ষা স্মরণ করার উপলক্ষ। তাই নতুন বছরে ইসলামি মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে ঈমান-আমল ও নৈতিকতার উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করাই হওয়া উচিত আমাদের অঙ্গীকার।
হিজরি বছরের প্রথম মাস মহাররম। এ মাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ দিন হলো ১০ মহাররম বা ইয়াওমে আশুরা। হাদিসে এ দিনের বহু ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। ইসলামপূর্ব আরব সমাজ এবং আহলে কিতাবদের মধ্যেও আশুরার বিশেষ গুরুত্ব ছিল। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজা পালন করা হতো এবং এদিন কাবা শরিফে গিলাফ পরানো হতো। পরে রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য হয় (সহীহ বুখারি)।
হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মদিনায় এসে দেখেন, ইহুদিরাও আশুরার দিনে রোজা রাখে। তারা জানায়, এদিন আল্লাহ তাআলা হজরত মূসা (আঃ) ও তাঁর কওমকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, হজরত মূসা (আঃ)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে মুসলমানরাই অধিক হকদার। এরপর তিনি নিজে আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও তা পালনের নির্দেশ দেন (সহীহ মুসলিম, সহীহ বুখারি)। তাই আশুরার দিন মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও তাৎপর্যময় একটি দিন।
আশুরার বিশেষ আমল : আশুরার দিনের প্রধান আমল হলো রোজা রাখা। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আশুরার রোজার বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা পূর্বের এক বছরের সগিরা গুনাহ মাফ করে দেন বলে তিনি আশা করেন (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২)। হজরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে এবং আশুরার দিনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে অন্য কোনো নফল রোজা পালন করতে দেখা যায়নি (সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম)।
সাহাবায়ে কেরাম নিজেরা আশুরার রোজা রাখার পাশাপাশি সন্তানদেরও এ আমলে অভ্যস্ত করতেন। হজরত রুবায়্যি‘ বিনতে মুআববিয (রাঃ) বর্ণনা করেন, শিশুরা ক্ষুধার কারণে কাঁদলে তাদের খেলনা দিয়ে ব্যস্ত রাখা হতো, যাতে তারা ইফতার পর্যন্ত রোজা পূর্ণ করতে পারে (সহীহ বুখারি, সহীহ মুসলিম)।
তাই আশুরার দিনে রোজা পালনের পাশাপাশি আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও নাজাত লাভের আশায় তওবা-ইস্তিগফার এবং নেক আমলের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আশুরার দিনে রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও মুস্তাহাব আমল। তবে শুধু ১০ মুহাররমে রোজা রাখার চেয়ে এর সঙ্গে ৯ বা ১১ মুহাররম মিলিয়ে আরও একটি রোজা রাখা উত্তম। বিশেষত ৯ ও ১০ মুহাররম একসঙ্গে রোজা রাখার কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আশুরার রোজা পালনকালে সাহাবিদের জানান যে, পরের বছর জীবিত থাকলে তিনি ৯ মুহাররমেও রোজা রাখবেন (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৩৪)। এজন্য ইবনে আব্বাস (রাঃ) ৯ ও ১০ মুহাররম রোজা রাখার পরামর্শ দিতেন (জামে তিরমিযি, হাদিস ৭৫৫)।
আরও উত্তম হলো ৯, ১০ ও ১১ মুহাররম- এই তিন দিন রোজা রাখা। এতে আশুরার ফজিলত অর্জনের পাশাপাশি মুহাররম মাসে অধিক রোজা রাখার আমলও আদায় হয়।
মুহাররম ও আশুরা কেন্দ্রিক কিছু গর্হিত রেওয়াজ : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের ওপর জুলুম করো না’ (সূরা তাওবা: ৩৬)। তাই মুহাররম মাসে বিশেষভাবে গুনাহ ও আল্লাহর নাফরমানি থেকে বিরত থাকা জরুরি। এ মাসের ফজিলতকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত নানা বিদআত, কুসংস্কার, অতিরঞ্জিত শোকানুষ্ঠান ও ভিত্তিহীন রেওয়াজ থেকে দূরে থাকা উচিত। কারণ ইসলাম মুহাররম উপলক্ষে নির্দিষ্ট কিছু আমল-বিশেষত আশুরার রোজা- ছাড়া অন্য কোনো বিশেষ নামাজ, জিকির বা আনুষ্ঠানিকতার নির্দেশ দেয়নি।
একই সঙ্গে ফজিলতপূর্ণ এ সময়ের নফল আমল থেকেও উদাসীন হওয়া উচিত নয়। ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল আমলের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর আরও নৈকট্য ও ভালোবাসা অর্জন করতে পারে, যেমনটি হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে। তাই নতুন হিজরি বছরে গুনাহ থেকে বেঁচে থেকে ফরজ ও নফল ইবাদতে মনোযোগী হওয়া এবং ঈমান-আমল, চরিত্র ও জীবনাচারে উন্নতি সাধনের অঙ্গীকার করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। আমাদের ঈমান-আমল, কর্ম-আচরণ, স্বভাব-চরিত্রসহ জীবনের সকল অঙ্গনে উৎকর্ষ আসুক- এই পণ নিয়ে শুরু হোক আমাদের আগামীর পথচলা। আল্লাহ তাআলা সকলকে সেই তাওফীক দান করুন- আমিন।
লেখক : প্রধান শিক্ষক, পশ্চিম বানিয়াখামার দারুল কুরআন বহুমুখী মাদ্রাসা।
খুলনা গেজেট/এনএম

