ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোকানুষ্ঠান কেবল বিদায়ের মঞ্চ নয়, বরং একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে। কোনো রাজনৈতিক ভাষণ বা হুমকির গর্জন ছাড়াই ইরান পবিত্র কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে।
জানাজার শোকের মঞ্চে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তৃতা ছিল না। এর পরিবর্তে বিভিন্ন মুসলিম দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে নির্দিষ্ট আয়াতের তেলাওয়াত করা হয়, যার প্রতিটিতে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা নিহিত ছিল।
১. আফগানিস্তানকে শোনানো হয় সূরা আল-ফাতহর আয়াত ১। এর অর্থ: নিশ্চয়ই আমি আপনাকে (হে মুহাম্মদ) একটি স্পষ্ট ও পরিপূর্ণ বিজয় দান করেছি।
পেছনের রাজনীতি: আফগান মন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ও প্রতিনিধিদল যখন হলে প্রবেশ করেন, তখন তাদের এই আয়াত শোনানো হয়। ২০ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমেরিকার মতো পরাশক্তিকে তাড়িয়ে আফগানিস্তানের যে ঐতিহাসিক বিজয়, এই তেলাওয়াতের মাধ্যমে ইরান সরাসরি তাদের সেই লড়াইকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক অনন্য ‘বিজয়ের অভিনন্দন’ জানিয়েছে।
২. বাংলাদেশকে শোনানো হয় সূরা আলে-ইমরানের আয়াত ১৬৯-১৭০। এর অর্থ: আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না; বরং তারা নিজেদের রবের নিকট জীবিত, তারা রিজিকপ্রাপ্ত। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের পেছনে যারা এখনো তাদের সাথে মিলিত হয়নি (অর্থাৎ জীবিত আছে), তাদের জন্য তারা এ সুসংবাদ গ্রহণ করে যে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।
পেছনের রাজনীতি: বাংলাদেশের জন্য এই আয়াতটি ছিল এক অনবদ্য প্রতীকী স্বীকৃতি। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব এবং জালিমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, ইরানের এই আয়াত তেলাওয়াত সরাসরি সেই শহীদদের আত্মত্যাগকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এক আধ্যাত্মিক সম্মান এনে দেয়।
৩. ফিলিস্তিনকে শোনানো হয় সূরা বনী ইসরাইলের আয়াত ১। এর অর্থ: পরম পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা (বায়তুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
পেছনের রাজনীতি: ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের সামনে ইসলামের প্রথম কিবলা আল-আকসার আয়াতটি তেলাওয়াত করার অর্থ ছিল অত্যন্ত গভীর। এর মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, খামেনির বিদায়ের পরেও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং জেরুজালেম মুক্ত করার লড়াই ইরানের কাছে সবচেয়ে পবিত্র এবং অবিচ্ছেদ্য এজেন্ডা হয়ে থাকবে।
৪. কাতারকে শোনানো হয় সূরা আল-ফাতহর আয়াত ১-৩। এর অর্থ: নিশ্চয় আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি, যেন আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন আর আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। এবং আল্লাহ আপনাকে বলিষ্ঠ সাহায্য দান করেন।
পেছনের রাজনীতি: কাতার দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে এবং বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে বড় বড় পরাশক্তির মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। এই আয়াতের মাধ্যমে কাতারকে তাদের এই স্বাধীন, সাহসী এবং সফল কূটনৈতিক অবস্থানের জন্য এক ধরণের ভূরাজনৈতিক সাধুবাদ ও ‘বিজয়’-এর শুভেচ্ছা জানিয়েছে ইরান।
৫. পাকিস্তানকে শোনানো হয় সূরা বনী ইসরাইলের আয়াত ৮০। এর অর্থ: বলো, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সঙ্গে এবং আমাকে নিষ্ক্রান্ত করাও কল্যাণের সঙ্গে এবং তোমার নিকট হতে আমাকে দান করো সাহায্যকারী শক্তি।
পেছনের রাজনীতি: পাকিস্তান সবসময় মুসলিম বিশ্বের সংকটগুলোতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করে। এই দোয়ার মাধ্যমে ইরান প্রকারান্তরে পাকিস্তানকে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও সংকট উত্তরণে একটি ‘সাহায্যকারী শক্তি’ হিসেবে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে।
৬. তুরস্ককে শোনানো হয় সূরা আন-নিসার আয়াত ৯৫। এর অর্থ: মুমিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে, যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন; আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহাপুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
পেছনের রাজনীতি: তুরস্ক মুখে ফিলিস্তিন বা মুসলিম উম্মাহর পক্ষে অনেক বড় বড় কথা বললেও, বাস্তবে ইসরায়েল বা পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সামরিক বা শক্ত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেয় না। এই আয়াতের মাধ্যমে ইরান তুরস্কের সেই ‘ঘরে বসে থাকা’ বা নিষ্ক্রিয় নীতিকে ইঙ্গিত করে এক ধরণের সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভর্ৎসনা করেছে।
খুলনা গেজেট/এএজে

