রবিবার । ২৮শে জুন, ২০২৬ । ১৪ই আষাঢ়, ১৪৩৩
ইমাম বুখারি (রহ.)

বুখারার এতিম বালক যেভাবে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বজয়ী হাদিস সম্রাট

গেজেট প্রতিবেদন

উজবেকিস্তানের বুখারা শহরের এক সংকীর্ণ গলি। এক কিশোর হেঁটে চলেছে ধীরপায়ে। জীর্ণ শরীর, চোখে কোনো জ্যোতি নেই। এক দূরারোগ্য ব্যাধি শৈশবেই কেড়ে নিয়েছিল তার চোখের আলো। কিন্তু স্নেহময়ী মায়ের আকুল প্রার্থনা, চোখের জল বৃথা যায়নি। অলৌকিকভাবে ফিরে এসেছিল সেই শিশুর চোখের দৃষ্টি। সাথে খুলে গিয়েছিল অন্তর্দৃষ্টি। সেই থেকে শুরু হয়েছিল এক মহিমান্বিত পথচলা। ইতিহাস তাকে চেনে ইমাম বুখারি নামে। পৃথিবীর বুকে যতদিন ইসলামের আহ্বান ধ্বনিত হবে, ততদিন অক্ষয় হয়ে থাকবে এই নাম।

বুখারি শব্দটি শুধু একজন মানুষের পরিচয় বহন করে না, বরং হাদিসশাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থও এই নামের পরিচয়ে পরিচিত। এই নামটির মাধ্যমে গ্রন্থ ও গ্রন্থকার একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছেন এবং স্থান করে নিয়েছেন ইতিহাসের সর্বোচ্চ শিখরে।

এক লাখ সহিহ হাদিসের মুখস্থ ভাণ্ডার
১৯৪ হিজরিতে বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারা শহরে জন্মগ্রহণ করেন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন ইসমাইল বিন ইব্রাহিম। সে সময় বুখারা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আলেম-উলামাদের প্রাণকেন্দ্র। শৈশবেই পিতাকে হারিয়ে এতিম হন তিনি। পুণ্যময়ী মায়ের কোলে বেড়ে ওঠেন এই বালক। মায়ের অনুপ্রেরণাতেই খুব অল্প বয়সে দ্বীনি শিক্ষার দিকে ধাবিত হন তিনি।

ইমাম বুখারির স্মরণশক্তি ছিল এক অলৌকিক নিয়ামত। তিনি নিজেই একবার বলেছিলেন, আমার এক লাখ সহিহ হাদিস এবং দুই লাখ অ-সহিহ হাদিস মুখস্থ আছে। তার তীক্ষ্ণ মেধার এক চমৎকার গল্প প্রচলিত আছে। ছাত্রজীবনে তার সহপাঠীরা যখন কলম-খাতা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন, বুখারি তখন শুধু শুনতেন, কিছুই লিখতেন না। সহপাঠীরা বিরক্ত হয়ে একদিন বলেই বসলেন, তুমি প্রতিদিন আমাদের সাথে শিক্ষকদের কাছে আসো, কিন্তু কিছুই তো লেখো না! তাহলে এখানে এসে তোমার লাভ কী?

তাদের ক্রমাগত জেরার মুখে একদিন বুখারি শান্ত কণ্ঠে বললেন, তোমরা যা লিখেছ তা নিয়ে এসো। দীর্ঘ ১৬ দিনের সেই সংগৃহীত হাদিসের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজারেরও বেশি। ইমাম বুখারি খাতা না দেখেই অবলীলায় একের পর এক সব হাদিস মুখস্থ শুনিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, সহপাঠীরা তাদের খাতার ভুলগুলো বুখারির মুখস্থ বলা হাদিস থেকে সংশোধন করতে লাগলেন। তখনই সবাই বুঝতে পেরেছিলেন, এই মেধার কোনো বিকল্প নেই।

এই অদম্য মেধা আর দৃঢ় ইচ্ছাশক্তিকে বুকে নিয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি মক্কা, মদিনা, বাগদাদ, মিশর, সিরিয়া ও নিশাপুরের মতো দূর-দূরান্তের জ্ঞানকেন্দ্রে ছুটে বেড়ান। শিক্ষা সমাপন শেষে যখন তিনি নিজে হাদিসের পাঠদান শুরু করেন, তখন চারপাশ থেকে হাজার হাজার ছাত্রের ঢল নামে। এই বিপুল জনপ্রিয়তাই এক সময় সমসাময়িক কিছু আলেমের মনে ঈর্ষার জন্ম দেয়, যা পরবর্তীতে তার জীবনের এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার কারণ হয়েছিল।

অনন্য এক সংকলন
ইমাম বুখারি তার বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-জামিউস সহিহ’ সংকলনে এমন এক বৈজ্ঞানিক ও কঠোর পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, যা এর আগে কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। তার স্মৃতিতে থাকা প্রায় ৬ লাখ হাদিস থেকে কঠোর যাচাই-বাছাই করে মাত্র ৭ হাজার ২৭৫টি হাদিস (পুনরাবৃত্তিসহ) তিনি তার গ্রন্থে স্থান দেন।

সুদীর্ঘ ১৬ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি হয়েছিল এই অনন্য সংকলন। মুসলিম বিশ্বের আলেম সমাজ এই গ্রন্থটিকে ইসলামের ইতিহাসে হাদিস শাস্ত্রের এক অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে গ্রহণ করেন। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তার বিখ্যাত গ্রন্থ মুকাদ্দিমায় লিখেছেন, আমাদের শিক্ষকেরা বলতেন, সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখা মুসলিম উম্মাহর ওপর এক পবিত্র ঋণ।

ইমাম বুখারি হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন:
১. হাদিসের বর্ণনাকারীকে অবশ্যই তার আগের শিক্ষকের সমসাময়িক হতে হবে এবং তাদের মধ্যে সরাসরি সাক্ষাতের প্রমাণ থাকতে হবে।
২. বর্ণনাকারীকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত, স্মৃতিমান, ন্যায়পরায়ণ ও খোদাভীরু হতে হবে।

ইসলামের ইতিহাসে পবিত্র কোরআনের পর সহিহ বুখারিকেই সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই গ্রন্থের ওপর বহু বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখা হয়েছে, যার মধ্যে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানির ‘ফাতহুল বারি’ অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয়।

শাসক ও সমসাময়িকদের রোষানল
ইমাম বুখারির জ্ঞান যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, তখন নিশাপুরের তৎকালীন প্রধান শায়খ মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া আল-দোহলির মজলিস ছাত্রশূন্য হতে শুরু করে। কারণ সব ছাত্র বুখারির দরবারে চলে আসছিলেন। এই জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে আল-দোহলি ইমাম বুখারির বিরুদ্ধে নানা অপবাদ ছড়াতে শুরু করেন। একপর্যায়ে তিনি ঘোষণা দেন, এই লোক যেন আমার শহরে না থাকে।

একই সময়ে বুখারার গভর্নরের সাথেও ইমামের দূরত্ব তৈরি হয়। গভর্নর চেয়েছিলেন ইমাম বুখারি যেন রাজপ্রাসাদে এসে তাকে এবং তার সন্তানদের আলাদাভাবে হাদিস শোনান। কিন্তু ইমাম বুখারি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, আমি জ্ঞানকে শাসকের দুয়ারে নিয়ে অবমাননা করতে পারব না। যার ইচ্ছা, সে সাধারণ মানুষের সাথে মজলিসে এসে শুনবে।

শাসকের এই আদেশ অমান্য করায় তাকে বুখারা থেকে নির্বাসিত করা হয়। জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি সমরখন্দের কাছাকাছি খরতঙ্ক নামের এক ছোট্ট গ্রামে আশ্রয় নেন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে এই একাকীত্ব ও মানসিক কষ্ট তাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল।

এক রাতে তাহাজ্জুদের নামাজ শেষে তিনি আল্লাহর দরবারে হাত তুলে কেঁদে বলেছিলেন, হে আল্লাহ, এই বিশাল পৃথিবী আজ আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে গেছে, তুমি আমাকে তোমার কাছে তুলে নাও। সেই মাস পার হওয়ার আগেই তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেন।

ইমাম বুখারির বিদায় ও ইতিহাসের অনুশোচনা
যে বাড়িতে ইমাম বুখারি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তার মালিক আবু মনসুর গালেব বিন জিবরিল সেই মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে বলেন, মৃত্যুর পূর্বে তিনি অঝোরে ঘামছিলেন। তিনি অসিয়ত করেছিলেন যেন তাকে তিনটি সাদা কাপড়ে দাফন করা হয়, কোনো জামা বা পাগড়ি যেন না দেওয়া হয়।

দাফনের পর এক অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল পুরো খরতঙ্ক গ্রাম। তার কবরের মাটি থেকে কস্তুরীর চেয়েও সুমিষ্ট এক সুবাস ছড়াতে শুরু করে, যা বেশ কয়েকদিন স্থায়ী ছিল। আকাশজুড়ে কবরের ওপর শুভ্র আলোর এক স্তম্ভ দেখা যেত। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মানুষ তার কবর দেখতে আসেন। এমনকি যারা জীবদ্দশায় তার বিরোধিতা করেছিলেন, তারাও কবরের পাশে এসে অশ্রুসজল চোখে নিজেদের ভুলের জন্য অনুশোচনা ও তাওবা করেন।

শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও ইমাম বুখারি এবং তার সহিহ বুখারি মুসলিম উম্মাহর কাছে এক অমূল্য সম্পদ। যত দিন যাবে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণীর সংরক্ষক এই অতন্দ্র প্রহরীর নাম তত বেশি উজ্জ্বল হয়ে থাকবে ইতিহাসের পাতায়।

সূত্র : আল জাজিরা

খুলনা গেজেট/রুএ




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন