বুধবার । ২৪শে জুন, ২০২৬ । ১০ই আষাঢ়, ১৪৩৩

আশুরার ইতিহাস, গুরুত্ব ও কুসংস্কার

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী

আমাদের দেশে কয়েকদিন পরেই পালিত হবে পবিত্র আশুরা বা ১০ মহররম। মুসলিম বিশ্বে আশুরার ব্যাপক গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। এই দিনে বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্রের মধ্য দিয়ে রাস্তা করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে পার করে দিয়েছেন। কুরআনের ভাষায় এটি ‘আরবাআতুন হুরুম’-অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের মধ্যে একটি। এ মাসে রোজা রাখার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আশুরার ইতিহাস : হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদিনায় আগমন করে দেখতে পেলেন যে, ইয়াহুদীগণ আশুরার দিনে রোজা পালন করে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার তোমরা এ দিনে রোজা পালন কর কেন? তারা বলল, এ অতি উত্তম দিন, এ দিনে আল্লাহ তা’আলা বনী ইসরাঈলকে তাদের শত্রুর কবল হতে নাজাত দান করেন, ফলে এ দিনে মূসা (আঃ) রোজা পালন করেন। রসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসার অধিক নিকটবর্তী, এরপর তিনি এ দিনে রোজা পালন করেন এবং রোজা পালনের নির্দেশ দেন (বুখারী:১৮৭৮)।

ইহুদি সম্প্রদায়ের ঈদ : সাহাবী আবূ মূসা (রাঃ) বলেন, ইয়াহুদী সম্প্রদায় আশুরার দিবসের সম্মান প্রদর্শন করত এবং তারা এ দিনকে ঈদ বলে গণ্য করত। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, তোমরাও এ দিনে রোজা পালন করো (মুসলিম:২৫৩১)।

কাবা শরিফে গিলাফ : শুধু মুসলমান নয়, অন্যান্য জাতি যেমন ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের কাছেও মুহররম ও আশুরার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তৎকালীন আরব সমাজে আশুরার গুরুত্ব এত বেশী ছিল যে, এই দিন পবিত্র কাবা শরিফে গিলাফ পরানো হতো। আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে মুসলিমগণ আশুরা রোজা পালন করতেন। সে দিনই কাবাঘর গেলাপে আবৃত করা হতো।’

রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা : আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা (সহিহ মুসলিম ২/৩৬৮)।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত : ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে রমজান ও আশুরার যেরুপ গুরুত্বের সঙ্গে রোজা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি (বুখারি ১/২১৮)।

এক বছরের গুনাহ মাফ : আবু কাতাদা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তা’আলার নিকট আমি আশা পোষণ করি যে, তিনি আশুরার রোজার মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের (গুনাহ) ক্ষমা করে দিবেন (মুসলিম)।’

বাচ্চারাও আশুরার রোজা রাখতো : আশুরার রোজাকে সাহাবায়ে কেরামের এত বেশী কদর করতেন যে, ছোট ছোট বাচ্চারা এই দিন রোজা রাখতো। এক হাদিসে বর্ণিত আছে, আশুরার সকালে (সাঃ) আনসারদের সকল পল্লিতে এ নির্দেশ দিলেন যে ব্যক্তি রোজা পালন করেনি, সে যেন দিনের বাকি অংশ না খেয়ে থাকে, আর যার রোজা অবস্থায় সকাল হয়েছে, সে যেন রোজা পূর্ণ করে। হাদিসের বর্ণনাকারী সাহাবী (রাঃ) বলেন, ‘পরবর্তীতে আমরা ঐ দিন রোজা রাখতাম এবং আমাদের শিশুদের রোজা রাখাতাম। আমরা তাদের জন্য পশমের খেলনা তৈরি করে দিতাম। তাদের কেউ খাবারের জন্য কাঁধলে তাকে ঐ খেলনা দিয়ে ইফতার পর্যন্ত ভুলিয়ে রাখতাম।’ (বুখারী:১৮৩৬)।

আশুরার রোজার পদ্ধতি : যেহেতু ইয়াহুদীরা মাত্র এক দিন অর্থাৎ মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখতো, সেকারণে মাত্র এক দিন রোজা না রেখে ন্যূনতম দুই দিন রোজা রাখা উত্তম বলে হাদিসে উল্লেখ আছে। সে কারণে ১০ মহররমের সাথে আগে বা পিছে একদিন মিলিয়ে মোট দুই দিন রোজা রাখা উত্তম।

আশুরাকেন্দ্রিক কুসংস্কার ও অনৈসলামিক কর্ম:
১. তাজিয়া, শোক পালন, শোক মাতম, শোকগাথা পাঠ ও শোক মিছিল।
২. শোকে জামা-কাপড় ছাড়া, বুক চাপড়ানো, শোক প্রকাশার্থে শরীরকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি। এগুলো সবই কু-প্রথা।
৩. অনেকে আবার এ মাসটিকেই অশুভ বা কুফু মনে করেন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এ মাসে করতে চান না। যেমন অনেক মুসলমান এ মাসে বিয়ে-শাদি থেকেও বিরত থাকেন। এটার কোনো ভিত্তি নেই। এটা কুসংস্কার।
৪. এ দিনের গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেকে নানা ভিত্তিহীন কথাও বলে থাকেন যার উল্লেখ কুরআন-হাদিসে নেই।
৫. এ মাসের আর একটি ঘটনা হলো হুসাইন রা.-এর শাহাদত। এটা উম্মতের জন্য নিঃসন্দেহে বড় একটি শোকের বিষয়। তবে আশুরার গুরুত্ব ও ফজিলতের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

লেখক : অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়; অস্ট্রেলিয়া থেকে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন