পতিত ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে নানা ঘটনায় রেকর্ড সৃষ্টি করার পর সংবাদপত্রে খবর হয়েছিল : ‘মাছের রাজা ইলিশ, আর দেশের রাজা পুলিশ’ পুলিশের ক্ষমতা দম্ভ নিয়ে যুগে যুগে কথা উঠেছে। কেউ কেউ বলেন, ‘বাঘে ধরলে এক ঘা, আর পুলিশে ধরলে ১৮ ঘা।’ আমাদের বাংলাদেশের এই পুলিশ নিয়ে কত যে কাহিনি। সপ্তাহখানেক পূর্বের ঘটনা। জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে নানাভাবে হেনস্তা করেছে পুলিশ। চট্টগ্রামের খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমান নাঈমকে বলেছিলেন, ‘চোখ নামিয়ে কথা বল।’ গত শুক্রবার রাত সাড়ে এগারোটার দিকে ঢাকায় প্রিমিয়ার লিগে অংশ নেওয়ার পর চট্টগ্রামে বিমানবন্দর থেকে সিএনজি যোগে বাড়ি ফেরার পথে তার সাথে এ ঘটনা ঘটে। অবশ্যই ঘটনার জের হিসেবে পুলিশের এক উপপরিদর্শক সহ এসআই দু’জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
পুলিশের কী দাপট! চট্টগ্রামের লালখান বাজার ফ্লাইওভার এলাকায় জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানের বহনকারী গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। নাঈম নিজেই জানিয়েছেন, একজন সাদা পোশাকধারী ব্যক্তি এবং দু’জন ইউনিফর্ম পরা পুলিশ সদস্য তাকে আকস্মিকভাবে মারধর শুরু করে। নিজের পরিচয় স্পষ্টভাবে জানানোর পরেও বেধড়ক মারপিট থামেনি।
নাঈমের প্রিমিয়ার লিগে খেলা চলছিল, তার ফ্লাইট বিলম্ব হয়েছিল। এয়ারপোর্টে নেমে সিএনজি নিয়ে যাওয়ার পথে রাত ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে তার সিএনজি দাঁড় করানো হয়। ড্রাইভারের কাছ থেকে কাগজপত্র নেয়া হলো। নাঈম নিজেই পুলিশকে বললেন, দরকার হলে আপনি আমার ব্যাগ চেক করেন।
কান্না জড়িত কণ্ঠে নাঈম বলেছেন, তাকে গলা চেপে ধরে জোরপূর্বক পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। তিনি প্রতিরোধ করে বের হয়ে আসার পরেও তার উপর বেপরোয়া নির্যাতন চলে। পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তি, যিনি নিজের কোনো পরিচয় দেননি, তিনি তার হাতে থাকা পাইপ দিয়ে নাঈমকে অব্যাহত আঘাত করেন বলে নাইম অভিযোগ করেছেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত শতাধিক মানুষ নাঈমের পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও মারপিট বন্ধ হয়নি।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমাকে গলা চেপে ধরে বলল, তুই গাড়িতে ওঠ, বলে আমাকে গাড়িতে তুললো। আমি বললাম, আপনি আমার গলা টিপে ধরছেন কেন, বলে ধাক্কা দিয়ে আমি বেরিয়ে আসলাম! এরপর আবার ধরে ওরা গলা টিপে ধরে আমাকে বেপরোয়া মারপিট করে। শারীরিকভাবে মারপিট ছাড়া ঝাঁঝালো কথায় হেনস্তা করে। মারধরের একপর্যায়ে একটা অটোরিকশায় তুলে ওরা আমাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেছেন ক্রিকেটার নাইম। আমি তাদেরকে কার্ড দেখালেও ওসব তারা দেখতে নারাজ বরং বলে তুমি আসামি। মারধরের একপর্যায়ে আমাকে থানায় নিয়ে যায় এসআই শফিকুল। এরপর ওসির কক্ষে নেওয়া হয়। এরপর ওসিকে তিনি যখন বারবার আসল বিষয় জানাচ্ছিলেন, তখন ওসি তাকে ধমক দিয়ে বলেন, ‘চোখ নামিয়ে কথা বল।’ এর মধ্যে একটি ফোন পেয়ে ওসি বেশ শান্ত হন। নাঈম সঙ্গে সঙ্গে বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তামিম ইকবাল পরবর্তীতে থানার ওসি এবং নাঈমের বাবার সাথে কথা বলেন এবং যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। নাঈম সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলে প্রশ্ন রেখেছেন, এখানে তো পুলিশের গাড়ি ছিল, তাতে না তুলে আমাকে কেন অটোতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল? তার কথা, আমার জায়গায় যদি সাধারণ মানুষ কেউ হতো, আর তাকে যদি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যেত, তা হলে তো কথা বলার কেউ থাকত না। তার কথা, পুলিশের হাতে যদি সাধারণ মানুষ নিরাপদ না থাকে তাহলে সেই পুলিশ রাষ্ট্রের এমন কোনো কল্যাণ করে?
সবকিছু দেখে শুনে মনে হয়েছে, পুলিশ আর কবে মানুষ হবে? পুলিশের মানসিক এবং চারিত্রিক দৈন্যতা নিয়ে কথা উঠেছে। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এ অঞ্চলের গণমানুষের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য পুলিশ বাহিনী সৃষ্টি হয়েছিল।
পুলিশ সম্পর্কে ডেফিনেশন ছিল, ‘দুর্জনেরে আঘাত করো, সুজনেরে রক্ষা করো।’ সেই পুলিশ কী এই পুলিশ? তিন অক্ষরের পুলিশ নামটি এ উপমহাদেশে এককালে ছিল অত্যন্ত জনবান্ধব অর্থাৎ জনগণের দুঃসময়ের প্রহরী বন্ধু। কিন্তু কাল পরিক্রমায় এ কী হলো? এখন পুলিশ দেখলে মানুষ আতঙ্কিত হয়, ফাঁসির আসামিকে জল্লাদ যেমন টেনে নিয়ে যায়, পুলিশকে দেখলে অমনি ভয়ংকর ছবি চোখের সামনে জেগে ওঠে! পুলিশকে দেখলে এখন নিরীহ সাধারণ মানুষ মনে মনে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আওড়ায় : ‘সেদিন চৈত্র মাস, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।’
একটু পিছনে ফিরে তাকাই। ব্রিটিশের কাছ থেকে ভারত ভাগ হয় ১৯৪৭ সালে। ১৪ আগস্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল হয় পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট হিন্দু ও অন্যান্য জাতি গোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল হয় হিন্দুস্থান। সালটি ছিল কিন্তু ১৯৪৭। মাত্র চার বছর গড়াতে না গড়াতেই পাকিস্তানের পুলিশের চেহারা সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত প্রহরে পুলিশ খুনি হিসেবে নাম লেখালো। সেই নাম বা দুর্নাম আজও ঘোচেনি। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। এর অর্থ পাঁচজনের বেশি কেউ রাজপথে চলতে পারবে না। সংঘবদ্ধ ‘মব’ দেখলেই পুলিশ ১৪৪ ধারা প্রয়োগ করবে। ছাত্র জনতার ক্ষোভ চরমে উঠলো, তাদের কথা ছিল দাবি আদায় করব, ১৪৪ ধারা ভাঙবো। কোনো আইনি বাধা মানি না।
যে কথা সেই কাজ। ১৯৫২’র ২১ ফেব্রুয়ারি (বাংলা ১৩৫৯ সালের ৮ই ফাল্গুন) তৎকালীন সরকারের পরিকল্পনা ও নির্দেশে পুলিশ ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামীদের মিছিলে বেপরোয়া লাঠিচার্জ এবং নির্বিচারেগুলি বর্ষণ করলো। একগুচ্ছ সংগ্রামী ছাত্র জনতা শহিদ হলো। পুলিশের বদনাম হলো। তৎকালীন নুরুল আমিন সরকারের এই ধৃষ্টতা বাংলাদেশের অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ভালো চোখে দেখেনি। যার ফল হিসেবে ১৯৫৪ সালে তৎকালীন শাসক দল মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বাহান্নর একুশের শহিদদের প্রতিশোধ হিসেবে পাকিস্তান সরকারের শাসক দলের আসন নড়বড়ে হয়ে যায়। শুধু পুলিশের গুলি বর্ষণের কারণে। ১৯৫৪’র নির্বাচনে হক ভাসানী মোর্চার যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হয়।
আবার বায়োস্কোপের মতো পালাবদল চলতে থাকে পাকিস্তানের শাসক মহলে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত অস্থিতিশীল সরকার চলতে থাকে। সর্বত্র অস্থির অবস্থা।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দারুণ স্বেচ্ছাচারিতা। এ অবস্থায় তৎকালীন সেনা প্রধান ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ আইয়ুব খান রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন ১৯৫৮ সালের ৭ এপ্রিল। স্বঘোষিত লৌহ মানব, মন গড়া পাতানো মৌলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এসকান্দার মির্জাকে বন্দুকের নলের মুখে হটিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন আইয়ুব খান। তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়ে শাসন কার্য পরিচালনা করেন। একটি দুষ্ট চক্র আইয়ুব খানের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, দেশ শাসন ভালো চোখে দেখেনি, তাই ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন শুরু করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলার স্বায়ত্ত শাসনের দাবিতে। যখন বেপরোয়া আন্দোলন ১৯৬৯ এর ২৪ জানুয়ারি সর্বাত্মক গণঅভ্যুত্থান ঘটে, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র আসাদের নেতৃত্বে। ১৯৬৯ এর এই গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান আইয়ুব খান এবং তারই অনুগত মোনেম খান গুলি চালানোর নির্দেশ দেয় নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র জনতার শান্তিপূর্ণ মিছিলে। নির্দেশ সরকারের ভয়াবহ হিংসাত্মকভাবে পালন করে এই পুলিশ। ততক্ষণে পুলিশ বুঝে ফেলেছে আমাদের অস্ত্র শাসক সরকারের লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করবে।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ লগ্নে পাকিস্তান সরকার জানতো পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা, বস্তির শ্রমিকরা আর সশস্ত্র পুলিশরা আমাদের বিরোধিতা করবে। তাই ১৯৭১ এর ভয়াল ২৫ মার্চের কাল রাতে তৎকালীন পাকিস্তান হানাদার সরকারের পরিচালিত অপারেশন সার্চলাইট এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, পূর্ব বাংলা অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর মানুষ। ওরা চেয়েছিল শুধু বাংলাদেশের মাটি থাকবে কিন্তু জমিনে প্রতিবাদী জনতা থাকবে না। তাই পাক আর্মি ওই রাতে রাজার বাগ পুলিশ লাইনে বেপরোয়াভাবে সশস্ত্র হামলা চালায় ভয়াবহ হত্যা লীলা সংগঠিত করে। টার্গেট অনুযায়ী ওরা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রাবাস, শ্রমজীবী মানুষের বস্তি এলাকায় বেপরোয়াভাবে গুলি চালিয়ে, হাজার হাজার প্রতিবাদী নিরীহ মানুষ হত্যা করে ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে। ওই সময় পুলিশ বাধ্য হয়ে দেশপ্রেমিক হয়েছিল।
কারণ, টিক্কা খান বাংলাদেশের জমিন চেয়েছিল। তার কথা ছিল, প্রতিবাদী বাঙালি যুবকদের হত্যা করো, তাদের যুবতী নারীদের ধর্ষণ করো, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দাও, আমরা চাই শুধু জমিন।
অবশ্যই একসময় বলা হতো, পুলিশ জনগণের অর্থাৎ নিরীহ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার রক্ষক। তাই পুলিশ অর্থ ছিল, police = P- Polite, O- Obedient, L- Loyal, I-Intelligent, C- Caragious, E- Energetic. এক কথায় পুলিশকে হতে হবে : পোলাইট, ওবিডিয়েন্ট, লয়াল, ইন্টেলিজেন্ট, ক্যারেযাস এবং এনার্জেটিক। কিন্তু কালে কালে সেই পরোপকারী পুলিশের একটি অংশ নৈতিক স্খলনের কারণে এখন দুষ্ট লোক ব্যঙ্গ করে বলে পাজির প, লুচ্চার ল, শয়তানের শ এই হয়েছে পুলিশের পরিচিতি। রাষ্ট্রের একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী সম্পর্কে এ ধরনের উচ্চারণের কারণ দুই চারজন পুলিশের নৈতিক কর্মকাণ্ড।
১৮ জুন বৃহস্পতিবার খুলনা গেজেট এ সেকেন্ড লিড এ একটি সেনসেটিভ খবর প্রকাশিত হয়। খবরটির শিরোনাম ছিল, ‘পুলিশ দম্পতির বিরুদ্ধে (স্বামী-স্ত্রী দু’জনই পুলিশের এএসআই) গৃহ পরিচারিকাকে নির্যাতনের অভিযোগ’ যা কেউ ভাবতে পারে না! আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোক হয়ে, উনারা সেই পৈশাচিক নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটিয়েছেন বাড়ির অসহায় নিরীহ গৃহপরিচারিকার সাথে। গত ১৭ জুন দুপুরে খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় নিজের ভাড়া বাসায় মিলন দাস নামের এক গৃহপরিচারিকাকে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে ওই দুই এএসআই অর্থাৎ ওই দম্পতির বিরুদ্ধে। সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় সোলার পার্কের পাশে একটি ভাড়া বাসায় হতভাগিনী মিলনকে গরম কড়াই দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্যাকা দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগে তাকে হিংস্রভাবে কান ধরে উঠ বস সহ বেধড়ক মারপিট করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে সোনাডাঙ্গা থানায় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে যায়। নির্যাতনকারী দম্পতি ওই থানারই পুলিশের এএসআই সঞ্জয় মিত্র এবং তার স্ত্রী পপি মিত্র সাহা।
যতদূর জানা যায়, নির্যাতিতা ওই গৃহপরিচারিকা নরসিংদীর বাসিন্দা। অসহায় পরিচারিকাকে পাঁচ বছর আগে সঞ্জয়ের বাসায় নিয়ে আসা হয় গৃহকর্মী হিসেবে। সঞ্জয়ের বাসায় থাকে খায় এবং যাবতীয় কাজকর্ম করে। ঘটনার দিন দুপুরে মিষ্টি কুমড়ার তরকারি পুড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে গৃহপরিচারিকার উপর নির্যাতনের খড়্গ নেমে আসে। স্বামী স্ত্রী দু’জন মিলে যৌথভাবে শারীরিক নির্যাতন চালায় ওই নারীর উপর। অকথ্য গালিগালাজ তো আছেই।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ‘ঘটনার দিন দুপুরে সোনাডাঙ্গা এলাকায় ওই বাড়িতে এক নারীকে লাঠি দিয়ে পৈশাচিক ক্রোধে উন্মত্ত অবস্থায় বেধড়ক মারপিট করা হচ্ছিল এবং একাধিক বার কান ধরে উঠবস করানো হচ্ছিল। পরবর্তীতে একজন সংবাদকর্মী এবং তিনজন সামাজিক সংগঠনের নারী নেত্রী বিষয়টি দেখে ফেলে এবং ওই বাড়ির ভেতর প্রবেশের চেষ্টা করলে তীব্র ভৎসনা করে তাদেরকে বাধা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নিরুপায় হয়ে ৯৯৯ এ কল দিয়ে কৌশলে তারা ওই বাড়ির ভেতরে ঢুকে নির্যাতিতা গৃহপরিচারিকাকে উদ্ধার করেন।’
সংক্ষিপ্তভাবে বললে, ‘ওই গৃহপরিচারিকার মুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে খুন্তি গরম করে ও কড়াই দিয়ে নির্দয়ভাবে আঘাতের ভয়াল চিহ্ন সৃষ্টি করা হয়েছে। মিষ্টি কুমড়া তরকারি পুড়ে যাওয়ার এই হচ্ছে দাস যুগীয় মাশুল! এই হৃদয়বিদারক নির্মম ঘটনাটি সারাদেশের মানুষকে দারুণভাবে আহত করেছে।’ এর আগেও গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন সময়ে মুখের কথা মুখে থাকতেই কাজের কোনো ত্রুটি পেলে ওই নারীর উপর এই দম্পতির নির্মম জুলুম নেমে আসত। এর আগেও তাকে ওইভাবে বেদম প্রহার ও আঘাত করা হয়েছে, তার চিহ্ন ওই শরীরে রয়েছে।
জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, পুলিশ হলে কি দম্ভ বা দাপট দেখাতে হবে? জনগণের প্রবল প্রতিবাদে চাপের মুখে ওই দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সত্য। তবে সবাই তাকিয়ে আছে আদালতের দিকে। এই যুগে এই দেশে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোক হয়ে দু’জনই দারোগা, স্বামী স্ত্রী মিলে অসহায় গৃহ পরিচারিকার উপর অবর্ণনীয় যে জুলুম হয়েছে তার বিচার এবং রায় কি আসে দেখার অপেক্ষায়। আমরা মনে করি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার আমলে যারা নাম গোত্রহীন পুলিশে ঢুকেছে এদের অধিকাংশই অতীত ইতিহাসে নানা অপরাধ কর্মে দাগি লোক, এদের জীবন ইতিহাস পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা নিজের ঘরে পৈশাচিকতা চালায়, ওরা কীভাবে এ ধরনের একটি সেনসিটিভ প্রতিষ্ঠানে নাগরিক স্বাধীনতা দেবে। ক্রিকেটার নাঈমের ঘটনা এবং নির্যাতিতা গৃহপরিচারিকা মিলনের ঘটনা একই সূত্রে বাঁধা। এই ধরনের পুলিশকে উপযুক্ত তদন্তের মাধ্যমে, তাদের দোষ বিচারের মাধ্যমে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক, দেশের সচেতন মহল তাই মনে করে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

