ছোট ছোট দু’কক্ষ বিশিষ্ট আধাপাকা ঘর আর সেই জমির মালিকানা, এতটুকুই ছিলো খুলনার ডুমুরিয়ার তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের শতাধিক পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। নদীভাঙন, চরম দারিদ্র্য আর ঠিকানাহীন জীবনের অবসান ঘটিয়ে মাথা গোঁজার যে শেষ আশ্রয়স্থল তারা পেয়েছিলেন, আজ তাও ধ্বংসের মুখে। তবে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং খোদ সরকারি এক উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মযজ্ঞে হুমকির মুখে পড়েছে এই অসহায় মানুষগুলোর জীবন। নদী সচল করার এই মহাপরিকল্পনা এখন রূপ নিয়েছে শতাধিক ভূমিহীন পরিবারের আর্তনাদে।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, কাঁঠালতলা এবং খর্নিয়া এলাকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প লাগোয়া বুড়িভদ্রা নদী খননের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই মানবিক বিপর্যয়ের সূচনা। নদী খনন করতে গিয়ে যত্রতত্র মাটি ফেলার কারণে কোথাও ঘরগুলোর ওপর আস্ত মাটির পাহাড় তুলে দেওয়া হয়েছে, আবার অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিংয়ের কারণে নদীগর্ভে ধসে পড়ার হুমকিতে পড়েছে বহু ঘর। কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষদের খাবার পানির জন্য তিনটি টিউবওয়েল এর মধ্যে দুটিই ইতোমধ্যে নষ্ট হয়েছে এই নদী খনন কর্মসূচিতে। বেশিরভাগ ঘরের মানুষদের টয়লেট ভেঙে দেওয়া হয়েছে খননের সময়ই। খর্নিয়া ও কাঠালতলা এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবারের মানুষ তাদের ঘরের খাট, হাঁড়ি-পাতিলসহ যৎসামান্য আসবাবপত্র আছে তাও বাইরে বের করে খোলা আকাশের নিচে এনে রাখে প্রহর গুনছেন কখন তার শেষ সম্বলটুকু ভেঙে পড়বে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০া২১ সাল এর ২৩ জানুয়ারি ও ২০ জুন এবং ২২ সালে তিনটি ধাপে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঠালতলা এলাকায় শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করে তৎকালীন সরকার। চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় খাস জমি চিহ্নিত করে দুই কক্ষবিশিষ্ট সেমি-পাকা ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়। জমিসহ ঘরের দলিল হস্তান্তরের দিন এই মানুষগুলোর চোখে ছিল আনন্দের জল। যারা একসময় রেললাইনের ধারে বা অন্যের বারান্দায় রাত কাটাতেন, তারা পেয়েছিলেন একটি স্থায়ী ঠিকানা। যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে আপার ভদ্রাসহ ৫টি নদীর (হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপারভদ্রা, টেকা ও শ্রী) ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ দেয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে নদী খননের এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ায় এই নদী খনন শুরু হয়।
চলতি বছর জানুয়ারিতে ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদী খননে ভেঙে ফেলা হয় ৮০ পরিবারের শেষ আশ্রয় স্থল। নির্বাচনের সময় সব দলের নেতাকর্মীরা গৃহহীন এই মানুষদের নির্বাচনের পরে সব ঠিক করার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনও আলোরমুখ দেখেনি। উল্টো মে মাস জুড়ে নতুন করে বিপাকে পড়ে কাঠালতলা ২৬টি পরিবার এবং খর্নিয়া উপজেলার আরও ২৫ পরিবার। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে নদী খননের এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।
গতকাল রবিবার দুপুরে সরেজমিনে ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদী থেকে তোলা পলিমাটির প্রচন্ড চাপে তার ঘরের পেছনের দেয়াল ও জানালা ভেঙে ভেতরে কাদা ঢুকে গেছে। নদী খননের মাটি যেভাবে ঘরের গা ঘেঁষে স্তূপ করে রাখা হয়েছে, তাতে যে-কোনো মুহূর্তে পুরো ঘর ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রচন্ড গরমে একদিকে যেমন ঘরে থাকার উপায় নেই, অন্যদিকে মাটির ভারে ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে ফাটল ধরেছে। এখানকার বাসিন্দারা এখন অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের খাবার রান্না করার জায়গা নেই, শিশুদের নিয়ে ঘুমানোর নিরাপদ আশ্রয় নেই।
কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা রহিমা বেগম (৬৫) অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, নদীতে ভাঙনে সব হারায়ে এইহানে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইছিলাম বাবা। সরকার ঘর দিছিল। এহন নদীর কাঁদা মাটি এনে আমাদের ঘরের ওপর ফেলছে। ঘরের দেয়াল চড়চড় করে ফাটতেছে। রাইতে ঘুমাতে পারি না, মনে হয় এই বুঝি মাটি চাপা পড়ে মরে গেলাম। জিনিসপত্র সব বাইরে এনে রাখছি।

খর্নিয়া এলাকার দিনমজুর আব্দুল জলিল বলেন, নদী কাটার সময় মেশিন দিয়ে ঘরের একদম গোড়া পর্যন্ত গর্ত করা হয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো নদীতে ধসে পড়বে। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের তো আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বাথরুম সব ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনটি পানি খাওয়ার কল ছিলো নষ্ট হয়ে গিয়েছে ২টি। এখন ২৬ পরিবারের একমাত্র ভরসা একটি টিউবওয়েল।
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, ডুমুরিয়ার বরাতিয়ার কাঠালতলা ও খর্নিয়ার গৃহহীন পরিবারের ঘরগুলোতে নদী খননের মাটি উঠে গেছে এই ঘটনা সত্য। এই নদী খনন প্রকল্প যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সোনাবাহিনীর তত্বাবধায়নে পরিচালিত হচ্ছে। আমি ইতোমধ্যে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা বলেছি। ওনারা বিষয়টি অবগত, খুব তাড়াতাড়ি ভূমিহীন এসব পরিবারের জন্য তারা ব্যবস্থা নেবেন। এছাড়া চুকনগরের যে পরিবারগুলো ছিলো, তারা ওই পাশের হাটের জায়গায় বসবাস করছে। কিছুদিন আগে কয়েকটি পরিবারকে অন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরিয়ে নেয়ার জন্য প্রস্তাব দেয়া হলেও তারা সেখানে যাননি। বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্যারকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
খুলনা গেজেট/এএজে

