শুক্রবার । ১২ই জুন, ২০২৬ । ২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

বিশ্বকাপের মহোৎসব শুরু আজ, ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত গোটা বিশ্ব

ক্রীড়া প্রতিবেদক

মেক্সিকো সিটির ভোর তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। কিন্তু আজটেকা স্টেডিয়ামের বাইরে মানুষের ঢল নেমেছে। কেউ হাতে জাতীয় পতাকা, কেউ মুখে প্রিয় দলের রং, কেউবা শুধু ইতিহাসের সাক্ষী হতে এসেছে।

স্টেডিয়ামের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ মেক্সিকান সমর্থক বলছিলেন, ‘আমি পেলের বিশ্বকাপ দেখেছি, ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ দেখেছি। এবার আমার নাতিকে নিয়ে এসেছি নতুন ইতিহাস দেখতে।’

এটাই বিশ্বকাপের শক্তি। প্রজন্মকে প্রজন্মের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষমতা। আজ থেকে শুরু হলো ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর- ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো- যৌথ ভাবে আয়োজন করছে এই টুর্নামেন্ট।

ফুটবল তার ভৌগোলিক সীমা ভেঙে এবার উত্তর আমেরিকাকে পরিণত করেছে এক বিশাল মঞ্চে। যেখানে বেসবলের দেশ ফুটবলের প্রেমে পড়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ঝকঝকে নীল আকাশের নিচে গত সোমবার জনসমক্ষে অনুশীলন করে যুক্তরাষ্ট্র দল। অবাক করা বিষয়- সেই অনুশীলন দেখতে সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ টিকিট কেটে হাজির হন।

যে দেশে বাস্কেটবল ও বেসবল দীর্ঘদিন ধরে জনমানসে আধিপত্য বিস্তার করেছে, সেখানে ফুটবলকে ঘিরে এমন উন্মাদনা এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত।

১৬ বছর আগে শিফিওয়ে শাবালালার বাঁ-পায়ের সেই দুর্দান্ত শট বিশ্বকাপের সূচনা করেছিল এক বিস্ময় দিয়ে। শাকিরার “ওয়াকা ওয়াকা” হয়ে উঠেছিল এক প্রজন্মের সংগীত। এবারও শাকিরা ফিরছেন উদ্বোধনী মঞ্চে।

তাঁর সঙ্গে থাকবেন বার্না বয়, জে বালভিন ও দক্ষিণ আফ্রিকার টাইলা। ফুটবল আবারও সংগীতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জানিয়ে দেবে- বিশ্বকাপ কেবল প্রতিযোগিতা নয়; এটি এক বৈশ্বিক সংস্কৃতির উৎসব।

নতুন ফরম্যাটে ১২টি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলবে দলগুলো। শীর্ষ দুই দলের পাশাপাশি সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দলও যাবে নকআউট পর্বে। অর্থাৎ ভুলের সুযোগ কম, নাটকীয়তার সম্ভাবনা বেশি।

তবে বিশ্বকাপের আলোয় ছায়াও রয়েছে। ভিসা জটিলতা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। ইরানি প্রতিনিধি দলের চলাচলে বিধিনিষেধ, আফ্রিকান কর্মকর্তাদের ভিসা জটিলতা, বিমানবন্দরে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ- এসব প্রশ্ন তুলেছে এই বৈশ্বিক উৎসবের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে। যে টুর্নামেন্টের মূল বার্তা হওয়ার কথা ঐক্য, সেখানে ভূরাজনীতির উপস্থিতি অস্বস্তিকর বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ কখনো বিশ্বকাপে খেলেনি। তবুও বিশ্বকাপ এ দেশের সবচেয়ে বড় অনানুষ্ঠানিক উৎসবগুলোর একটি। ঢাকার ছাদে উড়ছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকা। চায়ের দোকানে চলছে তর্ক। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাতভর খেলা দেখা। গ্রামের উঠোনে টেলিভিশনের সামনে বসবে পুরো পরিবার। একটি দেশের বিশ্বকাপে না খেলেও বিশ্বকাপকে নিজের করে নেওয়ার এই ক্ষমতা ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিস্ময়।

বিশ্বকাপ শেষ পর্যন্ত ট্রফির গল্প নয়। এটি মানুষের গল্প। যে বাবা তাঁর সন্তানের হাত ধরে প্রথমবার স্টেডিয়ামে যান, তাঁর গল্প। যে অভিবাসী হাজার মাইল দূরে বসে নিজের দেশের পতাকা ওড়ান, তাঁর গল্প। যে কিশোর রাত জেগে মেসি, এমবাপ্পে কিংবা ভিনিসিয়ুসের খেলা দেখে নতুন স্বপ্ন বুনে, তাঁর গল্প। আগামী এক মাস পৃথিবী হয়তো বিভক্ত হবে সমর্থনের রঙে। কেউ ব্রাজিল, কেউ আর্জেন্টিনা, কেউ ইংল্যান্ড, কেউ ফ্রান্স।

তবুও শেষ বাঁশি বাজলে আমরা সবাই একই সত্যের কাছে ফিরে আসব- একটি বল এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষাগুলোর একটি। আর সেই ভাষার নাম ‘ফুটবল’।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন