শনিবার । ৬ই জুন, ২০২৬ । ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

একের পর এক বিএসএফে’র পুশইন অপচেষ্টা রুখে দিলো বিজিবি

গেজেট প্রতিবেদন

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ কর্তৃক অবৈধভাবে পুশইনের ১০টি পৃথক অপচেষ্টা সফলভাবে রুখে দিয়েছে বিজিবি। একইসঙ্গে সম্ভাব্য পুশইন প্রতিরোধে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

অবৈধ অনুপ্রবেশ ও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাভাষী নাগরিকদের বাংলাদেশে জোরপূর্বক ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) সম্ভাবনা প্রতিরোধে সাতক্ষীরা সীমান্ত জুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে কঠোর নজরদারি জারি রেখেছে বিজিবি। সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টে জনবল বৃদ্ধি, দিনরাত টহল জোরদার এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সীমান্ত সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে বাহিনীটি।

সীমান্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কাকডাঙ্গা সীমান্তের বিপরীতে ভারতের হাকিমপুর বিএসএফ ক্যাম্পে কয়েকশ’ বাংলাভাষী মানুষকে জড়ো করে রাখা হয়েছে। তাদেরকে বাংলাদেশি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সুযোগ পেলে এসব মানুষকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হতে পারে। এমন আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে সীমান্তজুড়ে বিজিবি’র পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বিজিবি সূত্র আরও জানায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে সীমান্তের সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। তাই কোনো ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে বিজিবি সদস্যদের কর্মস্থলে অবস্থান নিশ্চিত করা হয়েছে। বাহিনীর সদস্যরা ঈদের সময়ও সীমান্তে দায়িত্ব পালন করেন।

বিজিবির কর্মকর্তারা বলেন, ‘সীমান্ত রক্ষার কাজ শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার দায়িত্ব নয়, সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী জনসাধারণেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা থাকলে সীমান্তের যে-কোনো অপতৎপরতা দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।’

বিজিবি অধিনায়ক বলেন, ‘অনঅনুমোদিত সীমান্ত অতিক্রম যাতে না ঘটে সেজন্য তারা স্থানীয়দেরও সতর্ক করছেন। এলক্ষ্যে রবিবার তলুইগাছ সীমান্তে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এবিষয়ে সীমান্তে বসবাসকারী জনসাধারণ বিজিবিকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছে।

ঝিনাইদহে বিজিবির মহেশপুর ব্যাটালিয়নের (৫৮ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ যাদবপুর সীমান্ত এলাকায় ৪-৫ জন ব্যক্তি বাংলাদেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করলে বিজিবি টহলদল তাৎক্ষণিকভাবে বাধা প্রদান করে। বিজিবির দৃঢ় অবস্থানের মুখে তারা পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে ফিরে যায়।

এদিকে মহেশপুরের বিওপি’র দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় বিএসএফে’র একটি প্রিজন ভ্যানে করে প্রায় ৩০-৩৫ জন ব্যক্তিকে সীমান্ত গেট খুলে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হয়। বিজিবি টহলদল ও স্থানীয় জনসাধারণের তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ উক্ত ব্যক্তিদের পুনরায় ভ্যানে তুলে অন্যত্র সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

বিজিবির খুলনা ব্যাটালিয়নের (২১ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্ত এলাকায় কয়েকজন নারী-পুরুষকে পুশইনের উদ্দেশ্যে সীমান্তের কাছে অবস্থান করতে দেখা যায়। বিজিবির প্রতিরোধমূলক তৎপরতার ফলে বিএসএফ তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

জয়পুরহাট ব্যাটালিয়নের (২০ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ কয়া ও বাসুদেবপুর সীমান্তের বিপরীতে ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ১০ ব্যক্তিকে একত্রিত করে পুশইনের প্রস্তুতির তথ্য পাওয়া যায়। পুশইন প্রতিরোধে বিজিবির তাৎক্ষণিক সতর্কতামূলক প্রস্তুতি গ্রহণ এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করার ফলে বিএসএফে’র পুশইন অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৩ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ সীমান্তের বিপরীতে ১৪৯ ও ৭১ ব্যাটালিয়ন বিএসএফ ক্যাম্পের নিকটবর্তী ৩টি হোল্ডিং সেন্টারে এসআইআর তালিকা থেকে বাদ পড়া ৪ মুসলিম নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে বলে গোয়েন্দা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। বিজিবি সেখানে কঠোর অবস্থান ও গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করেছে।

ঠাকুরগাঁও ব্যাটালিয়নের (৫০ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ হরিপুর সীমান্তের বিপরীতে ৮৭ ব্যাটালিয়ন বিএসএফে’র কাকরমনি ক্যাম্পের টহলদল ২ জন বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে নিজেদের হেফাজতে রেখেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিএসএফে’র পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত বিজিবির সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়নি।

পঞ্চগড়ের ব্যাটালিয়নের (১৮ বিজিবি) এর দায়িত্বপূর্ণ রওশনপুর সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক ১ ব্যক্তিকে পুশইন করা হলে স্থানীয় জনগণ তাকে আটক করে বিজিবিকে অবহিত করে। পরবর্তীতে বিজিবি ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাকে ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠায়।

মহানন্দা ব্যাটালিয়নের (৫৯ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ সীমান্তের বিপরীতে ভারতের মালদা জেলার ইংলিশ বাজার থানাধীন চন্দনপার্ক নামক স্থানে ভারতীয় পুলিশ কর্তৃক স্থাপিত একটি হোল্ডিং সেন্টারে আটক ২২ জনকে পুশইনের লক্ষ্যে বিএসএফে’র কাছে হস্তান্তরের তথ্য পাওয়া যায়। বিজিবি সেখানে কড়া নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।

সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ উৎমাছড়া সীমান্ত এলাকায় সন্দেহভাজন ২ ব্যক্তিকে স্থানীয় জনগণ আটক করে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করার পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ভারতে পুশব্যাক করা হয়।

এছাড়া নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের (৩১ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ কচুগড়া সীমান্তের বিপরীতে ভারতের আসাম রাজ্যের মহাদেব থানাধীন বলিশী গীতারাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫-২০ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের উদ্দেশ্যে একত্রিত করে রাখা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। সীমান্তের একটি অংশে প্রাকৃতিক কারণে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় ওই এলাকা দিয়ে পুশইনের সম্ভাবনা বিবেচনায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এদিকে বিজিবি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়েছে, সীমান্ত দিয়ে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন এবং দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার পরিপন্থি যেকোনো পুশইন প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে। সীমান্তে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও অপারেশনাল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন