বৃহস্পতিবার । ৪ঠা জুন, ২০২৬ । ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

যে কারণে ৩৮ বছরেও ভয়ংকর মেসি

ক্রীড়া প্রতিবেদক

কাতারে রূপালি ট্রফির গায়ে চুমু এঁকে যখন মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়টা লিখে ফেলেছিলেন, তখন মনে হয়েছিল বৃত্ত সম্পূর্ণ। লিওনেল স্কালোনির আর্জেন্টিনার রেনেসাঁ পৌঁছে গিয়েছিল চূড়ান্ত গন্তব্যে। পিটার ড্রুরির সেই অবিস্মরণীয় কণ্ঠস্বর তখন লুজাইল স্টেডিয়ামের আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল “লিওনেল মেসি হ্যাজ শেকেন হ্যান্ড উইথ প্যারাডাইস”।

ইন্টার মায়ামির চোটের ধাক্কা বা পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ের ক্লান্তি, সবকিছুকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সেনাপতি। কিন্তু কেন যে মানুষটি ২০২২ সালেই ফুটবল কমপ্লিট করে অমরত্বের সিংহাসনে বসে গেছেন, কোন টানে তিনি আবারও নামছেন এই মহাযজ্ঞে? এতকাল মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন পিঠে এক অন্তহীন পাহাড়সম প্রত্যাশার বোঝা নিয়ে। দিয়েগো মারাদোনার ছায়া তার পিছু ছাড়েনি।

বুয়েনস আইরেসের রাস্তা থেকে ভেসে আসা খোঁটা তাকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করেছে। কিন্তু কাতার বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল সেই অভিশাপমুক্তির রাত। এখন মেসি খেলছেন কোনো দায় ছাড়া, কোনো কিছু প্রমাণ করার তাগিদ ছাড়া। যখন একজন শিল্পীর ওপর থেকে সব বাধ্যবাধকতা টুটে যায়, যখন তার তুলির আঁচড় হয়ে ওঠে আরও স্বাধীন, আরও বিধ্বংসী, মেসি এখন খেলছেন কেবলই আনন্দের জন্য, ফুটবলকে ভালোবেসে। যে খেলাটি তাকে সবকিছু দিয়েছে, সেই খেলাটার সবুজ ঘাসে আরও কয়েকটা বিকাল কাটানো।

আর্জেন্টিনার বর্তমান দলটার দিকে তাকালে এক অদ্ভুত রসায়ন চোখে পড়ে। এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেস কিংবা অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এরা সবাই মেসির খেলা দেখে বড় হয়েছেন। এদের কাছে মেসি নিছক একজন অধিনায়ক নন, এক অলৌকিক চরিত্র। এটা স্পষ্ট যে আর্জেন্টিনার বর্তমান স্কোয়াডের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে মেসির ছায়া। আর্জেন্টিনার ফ্রি-কিক, লং-ডিস্ট্যান্স শটের নিখুঁত নিশানা কিংবা ট্যাকটিক্যাল পাসিং সবকিছুতেই মেসির জাদুকরী ছোঁয়া দৃশ্যমান।

কাতারের মেসি যদি ১০০-তে ১০০ হন, তবে এবারের মেসি অন্তত ৮০। কিন্তু এই ৮০ আরও বেশি বিপজ্জনক। কারণ, অনেক বেশি স্মার্ট এবং এনার্জি-সেভিং। মেসি এখন শক্তি অপচয় করেন না, বরং সঠিক সময়ে সঠিক ক্ষুরধার ছোবলটি মারেন। স্কালোনি খুব ভালো করেই জানেন, মাঠে মেসির শতভাগ ফিটনেস না থাকলেও ড্রেসিংরুমে তার কেবল উপস্থিতিটুকুই প্রতিপক্ষের বুকে কাঁপন ধরানোর জন্য যথেষ্ট। মেসি দলের জন্য এক রক্ষাকবচ। তরুণরা যখন মাঠে খেই হারিয়ে ফেলে, তখন মায়াবী বাঁ পায়ের একটা আলতো ছোঁয়া কিংবা জাদুকরী পাস পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

মেসি নিজের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে এই তরুণদের হাত ধরে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে আরেকবার পথ দেখাতে চান। ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক আমেরিকা, মেক্সিকো, কানাডা। মেসি বর্তমানে খেলছেন যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে, ইন্টার মায়ামির হয়ে। এবারের বিশ্বকাপ তার জন্য এক অর্থে নিজের সেকেন্ড হোমে খেলার মতো। চেনা মাঠ, চেনা দর্শক, আর নিজের বর্তমান ঠিকানার আঙিনায় বিশ্বকাপ ধরে রাখার এই লড়াই মেসির জন্য এক পরম মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি।

তিনি তো সেই জাদুকর, যিনি চাঁদের আলো পকেটে পুরে লুজাইলের রাতকে আলোকিত করেছিলেন। মেসি ২০২৬ বিশ্বকাপে এসেছেন ফুটবলকে এক শেষ রূপকথা উপহার দিতে। উত্তর আমেরিকার সবুজ গালিচায় যখনই বল তার পায়ে গিয়ে চুমু খাবে, বিশ্ববাসী আরও একবার বলবে ধন্য আমরা। আমরা মেসির যুগে জন্মেছিলাম।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন